অভিযোগের পাহাড়, প্রদীপের ফাঁসিই ভুক্তভোগীদের একমাত্র চাওয়া

কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের নাজিরপাড়ার বাসিন্দা রোকেয়া আক্তার। ২০১৮ সালে তার স্বামী মোহাম্মদ হোসেনকে প্রদীপ (বরখাস্ত তৎকালীন ওসি) ধরে নিয়ে যান।

দাবি করা হয়, মোটা অংকের টাকা। অভাবের সংসারে স্বামীকে ছাড়াতে টাকা দিতে পারেননি রোকেয়া। প্রদীপের দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ওই বছরের ২৯ অক্টোবর হোসেনকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

রোকেয়া বলেন, ‘গেল দুটি বছরের একেকটি রাত যেন একেকটি বছর। যন্ত্রণায় কাটছে সময়। ভরণ-পোষণের টাকা নেই। পিতৃহীন ছয় বছরের একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ মোস্তাকিম চিৎকার করে খোঁজে বাবাকে। কিন্তু ছেলেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা তো আমার জানা নেই।’

সোমবার কক্সবাজার আদালত চত্বরে ‘অসহায় নির্যাতিত সমাজ ও লাভ বাংলাদেশের’ ব্যানারে মানববন্ধন শেষে প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন রোকেয়া আক্তার। এসময় তিনি ওসি প্রদীপসহ বাকি আসামিদের বিচার চেয়ে বক্তব্য দেন।

মানববন্ধনে শতাধিক ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ প্রদীপের ফাঁসি দাবি করেন। তারা বলেন, প্রদীপের কঠিন শাস্তি না হলে আমাদের স্বজনদের ‘আত্মা’ শান্তি পাবে না।

রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘একজন প্রদীপ আমার সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়েছেন। আমি তার বিচার চাই। আমার স্বামীকে যেভাবে হত্যা করেছে তাকে সেভাবে মারা হোক।’

‘একসময় শহরে ভাড়া বাসায় থাকতাম। এখন বাপের বাড়িতে থাকি। খুব কষ্টে আছি। অবুঝ সন্তান নিয়ে কঠিন দিন পার করছি। সন্তানকে স্থানীয় একটি নুরানি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি, কিন্তু পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি না। এখন দু’মুঠো খাবার জুটে না ঠিক মতো।’

মানববন্ধনে সমিরা নামের আরেক ভুক্তভোগী তুলে ধরেন দুঃখের কথা। এই নারীর বাড়িও টেকনাফ শহরের নাজিরপাড়ায়। তিনি বলেন, ‘তারাবির নামাজ পড়া অবস্থায় আমার স্বামী বেলালকে দুই বছর আগে (তখন ২৭ রোজার দিন) ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। পরে চার হাজার ২০০ ইয়াবা, দুটি গুলি উদ্ধার দেখানো হয়। তাকে ছাড়াতে অনেক দেন-দরবার করেছি। কিন্তু যে মোটা অংকের টাকা চাওয়া হয় তা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে (স্বামীকে) ছাড়িয়ে আনতে পারিনি। আমার স্বামী এখন জেলে। তিন ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে। সবশেষ আমি প্রদীপসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছি।’

বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ২৪ লাখ টাকা দাবি করা হয় টেকনাফ শহরের আরেক বাসিন্দার কাছে। সব টাকা দিতে না পারায় স্ত্রীর সামনে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় নুর মোহাম্মদ নামে একজনকে। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে এই ঘটনা ঘটে।

নুর মোহাম্মদের ভাই নুরুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালে ১৯ মার্চ তার ভাইকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ২৪ লাখ দাবি করে প্রদীপ ও এসআই সঞ্জিত দত্ত। স্বর্ণ, জমানো লবণ বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা তাদের হাতে তুলে দিই। বাকি ৩৫ লাখ না দেওয়ায় ২০ মার্চ সারারাত শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরে ২১ মার্চ রাতে আমার ভাই ও তার স্ত্রী লায়লা বেগমকে গাড়িতে করে রাজারছরায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ৩টার দিকে ‘স্ত্রীর সামনে’ গুলি করে হত্যা করা হয়। এ দৃশ্য দেখে বেহুঁশ হয়ে যায় লায়লা। পরে তাকে (লায়লা) পুলিশের গাড়িতে করে নাজিরপাড়া রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়।’

পরবর্তী সময়ে রাতে গোপনে তার ভাইকে দাফন করা হয় জানিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পোস্ট মর্টেম করে আমার ভাইয়ের লাশ বুঝিয়ে দেয় পুলিশ। কিন্তু জানাজার মাইকিং করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দিনে জানাজা পড়াতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে রাতে জানাজা ও দাফন করতে হয়।’

মানববন্ধনে নির্যাতিতদের পক্ষে বক্তব্য দেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের জেলা সভাপতি নাজনীন সরওয়ার কাবেরী।

প্রদীপকে পুলিশ বাহিনীর ‘কুলাঙ্গার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে (প্রদীপ) মাদক নির্মূলের নামে মাদক ব্যবসা করেছে। মানুষ খুনের নেশায় মেতেছে। বিরাট মিশন নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে ঢুকেছিল। সিনহার মতো দেশের সম্পদকে শেষ করে দিয়েছে। শুধু একবার নয়, প্রদীপের শতবার ফাঁসি হতে হবে। বিচার বহির্ভূতভাবে ২০৪ জনকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে ঠিক সেভাবে প্রদীপ ও তার অনুসারীদের শাস্তি হওয়া চাই।’

আদালতে প্রদীপের পক্ষ নেয়া আইনজীবী রানা দাশ গুপ্তকে প্রশ্ন ছুড়েন নাজনীন সরওয়ার কাবেরী। তিনি বলেন, ‘কত লক্ষ-কোটি টাকার বিনিময়ে খুনি প্রদীপের পক্ষ নিয়েছেন? একজন চিহ্নিত খুনির পক্ষ নিয়ে নিজেও অপরাধী হয়ে গেলেন না তো!’

গত বছরের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। সেই ঘটনায় মামলা করেন নিহতের বড় বোন। মামলা তদন্ত শেষে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয় এলিট ফোর্স র‌্যাব। আজ সেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
এই মামলায় আসামি যারা

এই মামলায় আসামিদের মধ্যে থানা পুলিশের নয় সদস্য হলেন- টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলী, কনস্টেল রুবেল শর্মা, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুল করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া ও কনস্টেবল সাগর দেব নাথ।

অপর আসামিরা হলেন- আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্য যথাক্রমে এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজিব ও মো. আব্দুল্লাহ এবং টেকনাফের বাহারছড়ার মারিষবনিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশের করা মামলার সাক্ষী নুরুল আমিন, মো. নিজাম উদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ওসি প্রদীপ, কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *