এবার ‘নতুন রূপে’ রাজপথে বিএনপি!

জাতীয় নির্বাচনের প্রায় আড়াই বছর বাকি থাকতেই ব্যাপক সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ভেতরে ভেতরে নানা তৎপরতা শুরু করেছে রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা বিএনপিও।

নিয়েছে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে এক দফা দাবিতে ‘নতুন রূপে’ আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনের প্রায় আড়াই বছর সময় বাকি থাকলেও

এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা দলটি। বিশেষ করে বিশ্বস্ত, ত্যাগী ও সাহসী নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে এনে দলকে তৃণমূল থেকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে হাইকমান্ড। একই সঙ্গে অভিন্ন দাবিতে বাম-ডানসহ

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। দলের একাধিক নীতিনির্ধারক সূত্র থেকে জানা যায়, জোট গঠনের আগে প্রথমে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুগপৎ এবং পরে একমঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের পরিকল্পনা নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

দাবির সপক্ষে সমর্থন পেতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে নানাভাবে তদবির-লবিং শুরু করেছেন তারা। জনগণ, সুশীল সমাজ ও বিদেশিদের আস্থায় নিতে ‘রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে’ সরকারপ্রধান কে হবেন- তার ইঙ্গিতসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেবে দীর্ঘ এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি।

এবারের আন্দোলনকে ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই হিসেবে বিবেচনায় নিয়েই ঢাকার ‘রাজপথ দখলের’ প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করেই রাজপথে নামতে চায় বিএনপি। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের দাবিতে কর্মসূচি দেবে তারা। সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার

পরিকল্পনা করছে দলটির হাইকমান্ড। জোটের শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও মতামত নেওয়া হবে। অবশ্য সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপির কাঙ্ক্ষিত এক দফা দাবি আদায়ের পথে দুটি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। প্রথমত, সুসংগঠিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ

সরকারের দাবি আদায় করা; দ্বিতীয়ত, এই দাবি আদায় করতে না পারলে কোনোরূপ একতরফা নির্বাচনের প্রহসন অনুষ্ঠান অসম্ভব করে তোলার মতো শক্তি অর্জন করা।এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, বিগত দুটি নির্বাচনে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনোমতেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

এর আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কি নেব না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের ওপর। সরকার দাবি পূরণ না করলে আমাদের বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নামতে হবে। আন্দোলন সফল করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা আমরা করব।
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন,

নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করতে সব দল ও মতকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য বিএনপিকে পুনর্গঠন করে শক্তিশালী করা হচ্ছে। জামায়াতকে জোটে রাখা সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কিছু বলার সময় এখনও হয়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সংগঠনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, ২০১৪ সালের একতরফা ও ২০১৮ সালে মধ্যরাতের নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আবারও কারসাজির নির্বাচনের শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতি হিসেবে চরম সংকটের দিকে ধাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন না হলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথও রুদ্ধ হয়ে যাবে। এটি কারও জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা আশা করব, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে দেশকে সংকটের হাত থেকে রক্ষা করবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে সংকট রয়েছে। তারা আশা করেন, এ সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ও দায়বদ্ধ দলে পরিণত হবে। বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না।
বিএনপি নেতারা বলছেন,

দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের চরিত্র দেশের জনগণ ও উন্নয়ন সহযোগী বিদেশিদের সামনে উন্মোচন করেছে। দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তারা। একই সঙ্গে তারা এটাও মনে করেন, দেশের গণতন্ত্র ‘পুনরুদ্ধার’ করা শুধু বিএনপির একার পক্ষে সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ ব্যাপক গণআন্দোলন প্রয়োজন।

স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি : দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিগত দিনের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ, জনগণের স্বার্থে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দেশবাসীর সামনে নতুন বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেবে বিএনপি। বিশেষ করে বিগত নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশিদের সামনে ক্ষমতায় গেলে কে হবেন সরকারপ্রধান- তা স্পষ্ট করতে না পারা ভুল ছিল বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। তাই এবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তারও একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকবে।

এরই মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা স্পষ্ট করার ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানা গেছে। সূত্রে আরও জানা গেছে, ক্ষমতায় গেলে আরও উল্লেখযোগ্য কী কী কাজ করবে, তারও কিছু প্রতিশ্রুতি আগাম জানাবে বিএনপি। অঙ্গীকারের মধ্যে থাকবে অতীতমুখী না হয়ে ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় নেতৃত্ব দেওয়া।

যে কোনো সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মাটি থেকে অপর কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়াই থাকবে অন্যতম অঙ্গীকার। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সৃজনশীল, ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সরকার ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার প্রতিজ্ঞা করবে দলটি। প্রতিশ্রুতিতে আরও থাকবে প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা অবসানকল্পে

প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার প্রতিশ্রুতি। জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রভৃতি একগুচ্ছ নীতিগত প্রতিশ্রুতি। এবার ‘নতুন রূপে’ রাজপথে : নির্বাচন লক্ষ্য করে এরই মধ্যে দলের তৃণমূল থেকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে করোনা মহামারি পরিস্থিতি অবনতির কারণে সভা-সমাবেশ ও কর্মিসভার মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতিতে চলছে।

করোনা সংক্রমণ কমে এলে পুরোদমে সর্বস্তরে আন্দোলন উপযোগী নতুন কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের কাজ চলবে। অবশ্য বর্তমানে ভার্চুয়াল সভা-সেমিনারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূল নেতাদের চাঙ্গা করছেন। বিগত ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন ঠেকানো এবং ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ে আন্দোলন করে ব্যর্থ হয় বিএনপি। বিশেষ করে দেশের বেশিরভাগ জেলা ‘অচল’ করে দিলেও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীতে তেমন কিছুই করতে পারেনি দলটি।

এ জন্য দলের নগর কমিটির নেতাদের দায়ী করে আসছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ঢাকায় আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে রাজপথ দখলে নিয়ে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে নানামুখী কৌশল গ্রহণ করছে দলটি। অবশ্য সোমবার আলোচনা সভায়ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমনটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে এক দফা দাবিতে আন্দোলনে যেতে হবে বিএনপিকে।

দলীয় সূত্র জানায়, এবার বিএনপির সামনে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং না নেওয়ার প্রশ্ন নেই। সরাসরি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করার এক দফা দাবিতে গণআন্দোলন গড়তে হবে। এক দফা দাবি আদায় করতে হলে বিশ্বস্ত, ত্যাগী ও সাহসী নেতাকর্মী প্রয়োজন। যারা দেশ, গণতন্ত্র ও দলের জন্য জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে মাঠে নামবে- সে ধরনের নেতৃত্ব খুঁজে বের করে বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আনার চেষ্টা শুরু করেছে হাইকমান্ড। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, জেলা ও মহানগর কমিটিতে

দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া নেতাকর্মীদের দিয়ে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে পদহীন সাবেক ছাত্রদল ও যুবদল নেতাদের খুঁজে পদায়ন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যারা দলের দুর্দিনে বেইমানি করেননি এবং ভবিষ্যতে করবেন না, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হচ্ছে। সরকার তথা প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করবেন না, লোভে পড়ে নৈতিকতা বিসর্জন দেবেন না- এমন আস্থাবান ও বিশ্বস্ত নেতাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, অতীতে রাজধানীর শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ নৈতিকতা দেখাননি।

এবার সরকার সর্বশক্তি নিয়োজিত করলেও নৈতিক মনোবল হারাবে না- এমন নেতাকর্মীকে নেতৃত্বের আসনে আনা হচ্ছে। তবে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে কিছুটা বিতর্ক উঠেছে। কেন্দ্র থেকে বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম তৃণমূলে কমিটি গঠন করতে গিয়ে সাবেক এমপি প্রার্থী, মহানগর, জেলা ও উপজেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে পদবাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ উঠছে। ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ার উদ্যোগ :দলীয় সূত্র জানায়, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায়ে ডান-বাম সব রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে এক প্ল্যাটফর্মে একত্র করতে চায় বিএনপি।

এ ব্যাপারে দলের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অভিন্ন দাবিতে প্রথমে দলগতভাবে আদর্শভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি এবং পরে একমঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে ২০ দলকে কার্যত ‘নিষ্ফ্ক্রিয়’ করে রাখার কৌশল চলছে, যাতে বৃহত্তর ঐক্যজোটের পথে অন্যতম বাধা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে ধীরে ধীরে জোটের বাইরে ঠেলে দেওয়া যায়। সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ‘সখ্য’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে ‘ব্র্যান্ডিং’ করে লাভবান হয়েছে। এবার জামায়াত ইস্যু থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে এবং বিদেশিদের সামনে নিজেদের নতুন অবস্থান পরিস্কার করতে চায়, যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির হাত ধরে জামায়াতই ক্ষমতায় আসবে- আওয়ামী লীগ এ প্রচার চালাতে না পারে। এ বিষয়ে ঐক্যফ্রন্ট, বাম, ইসলামী দলসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক এবং ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেন, গত ১২ বছরের শাসনামলে প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বিশেষ করে ২০১৮ সালের রাতের বেলায় ভোট ডাকাতির বিষয়ে এখনও তাদের বোধোদয় হয়নি। আগামী নির্বাচনেও ইঞ্জিনিয়ারিং করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন দল যার যার অবস্থান থেকে যুগপৎ আন্দোলন করতে পারে। বামদের নিয়ে জোট সম্প্রসারণের সুযোগ কম বলে মনে করেন তিনি। জামায়াত ইস্যুসহ নানা জটিলতার কথা উল্লেখ করে মান্না বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে সফল হওয়া গেছে।

এখন সমস্যা হচ্ছে, যারা বড় বিরোধী দল, তারা এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় বা বর্জনের বিষয়ে কঠিন আন্দোলন-সংগ্রামের দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি সমকালকে বলেন, সরকার জনগণের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় এসে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ শাসন করছে। সুষ্ঠু ভোট হলে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আবারও ক্ষমতা ধরে রাখার নানা চেষ্টা শুরু করেছে। সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে ফেলেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে অভিন্ন দাবিতে সব রাজনৈতিক দলের নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুগপৎ আন্দোলন হতে পারে। সেই রাজপথের আন্দোলনই বৃহৎ গতিপথ দেখিয়ে দেবে।

নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলের রাজপথেই ঐক্য তৈরি হবে। এতে জামায়াতকেন্দ্রিক ২০ দলীয় জোটের বদলে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ই হবে বিএনপির মূল মিত্রশক্তি। ধীরে ধীরে আন্দোলন গণআন্দোলনের পরিণতি লাভ করবে একক মঞ্চে। একই সঙ্গে ‘ছায়া সরকারে’র ইঙ্গিত দেওয়া হবে নতুন জোটের শরিকদের সামনে। আগামীতে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির একমঞ্চ থেকে আন্দোলন না করার কৌশল সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে তারা এখনও অবহিত নন। ২০ দলীয় জোটের কোনো সভায়ও বিষয়টি এখনও আলোচনা হয়নি। যেহেতু বিষয়টা এখনও তারা জানেন না, সেহেতু এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।
আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে লবিং

বিএনপির আন্তর্জাতিক উইং সূত্র জানায়, দল ও জোটগতভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়েও জোর লবিং শুরু করেছে বিএনপি। এরই মধ্যে দলের আন্তর্জাতিক উইংকে শক্তিশালী করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিদের বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা নীরব কর্মতৎপরতায় বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক ক্ষমতাধর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক জনমত বা চাপ তৈরি করতে নিজেদের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও ব্যক্তিরা।

বিএনপির আন্তর্জাতিক উইংয়ের প্রধান ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের বিগত দুটি নির্বাচন সম্পর্কে জাতিসংঘসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক সব দেশ অবগত। নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়। সব গণতান্ত্রিক দেশই বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকুক চায়। তাদের শঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা কী বয়ে আনবে- তা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আজ দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নৈতিক সমর্থন থাকবে বলে আমরা আশা করি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে সব দেশের সঙ্গেই কমবেশি তাদের যোগাযোগ আছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *