দুর্বল পুরুষের জন্য দুই ফাইল যথেষ্ট, জানা গেলো চোখ ধাঁধানো তথ্য

দুর্বল পুরুষের জন্য দুই ফাইল যথেষ্ট, জানা গেলো চোখ ধাঁধানো তথ্য

নাম খন্দকার কবীর হোসেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই। তারপরেও সকল রোগ নিরাময়ের শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে করছেন চিকিৎসা।

একই সাথে নানা প্রকারের ওষুধ তৈরি করছেন। যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিক পাড়ায় ননী ফল নার্সারীর অন্তরালে

তিনি চিকিৎসার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচারণার মাধ্যমে প্রতারণা জোরদার করা হচ্ছে। তার মূল টার্গেট হচ্ছে যৌ’ন দুর্বল মানুষ।

অভিযোগ উঠেছে, সেখানে বিভিন্ন রোগের চিকিসার নামে প্রতিদিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, কবীরের দাওয়াখানায় ৩ হাজার টাকার নিচে চিকিৎসা নেই। কারো কারো কাছ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়ার তথ্য মিলেছে।

সব চেয়ে বেশি প্রতারিত হচ্ছেন প্রবাসীরা। বিগত দিনে প্রশাসনিক চাপে ভুক্তভোগীর টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন কবীর হোসেন। ওষুধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক বলেছেন, মস্ত বড় এই প্রতারকের ব্যাপারে জেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে।

কবীর হোসেনের আখড়ায় অবস্থান করে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে বলছেন একটা দুর্বল পুরুষের জন্য এই দুইটা ফাইল যথেষ্ট। জীবনে আর ওষুধ খেতে হবেনা। সে যত বড় সমস্যা হোক না কেনো। এছাড়া চুলকানী, কষা, খিচা ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক, পেটের গন্ডগোল, হজমের সমস্যা, লিভার নষ্ট, হৃদরোগ ও ক্যান্সারসহ নানা রোগের কাজ করে এই ওষুধ। তার এই বয়ান শুনে মানুষ খুব সহজে বোকা বনে যাচ্ছে। হাজার হাজার টাকা দিয়ে নিচ্ছেন চিকিৎসা। তবে কারো রোগ সেরেছে এমন রেকর্ড পাওয়া যায়নি। রোগীদের উদ্দেশ্যে কবীরের ভাষ্য, তিনি বিদেশী গাছ ও গাছের শিকড় দিয়ে সব ধরণের ওষুধ তৈরি করেন। রোগ সেরে যাবে শতভাগ গ্যারান্টি।

২৪ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন দুবাই ছিলেন। চলতি মাসে দেশে ফিরেছেন। যৌন সমস্যাও চুলকানীর জন্য কবীর হোসেনের কাছে আসেন। প্রথমবারে ওষুধ দেয়ার পর তার কাছ থেকে ১১ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নে তিনি জানান, বিদেশে থাকাকালীন তিনি কবীরের চিকিৎসা পদ্ধতি ইউটিওব ও ফেসবুকে দেখেন। এরপর দেশে ফিরে চিকিৎসা নেয়ার জন্য চলে আসেন।

যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের এক যুবক জানান, তার তিন বন্ধু বিদেশ থাকেন। সোস্যাল মিডিয়ার প্রচারণা দেখে কবীরের কাছ থেকে ওষুধ নেয়ার জন্য তাকে পাঠিয়েছেন। দুই প্রকারের ওষুধ দিয়ে ৩ হাজার করে মোট ৯ হাজার টাকা নেয়া হয়।

চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, তিন হাজার টাকার কমে কোনো ওষুধ নেই। তার কাছ থেকেও তিন হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। যৌন সমস্যা নাকি সারা জীবনের জন্য সেরে যাবে।

মাগুরা থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, এখানে তিনি বার এসেছেন। ওষুধ নিয়েছেন ৯ হাজার টাকার। কিন্তু তার সমস্যার সমাধান হয়নি। আসলেই ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে তিন হাজার টাকার ওষুধ। সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয়েছে, পুরাতন সমস্যা একটু সময় লাগবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, খন্দকার কবীর হোসেন ছাতিয়ানতলা গ্রামের ভাড়া বাড়িতে প্রথমে ছাদে বাগান করেন। এর ১ বছর পর তিনি ছাতিয়ান তলা মল্লিক পাড়ায় তিনি ননী ফল নার্সারি করেন। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই নার্সারিকে পূজি করে শুরু হয় তার মানুষ ঠকানোর ব্যবসা। বর্তমানে তিনি মল্লিক পাড়ায় ২০ বিঘার বেশি জমি ক্রয় করেছেন। ২ টি বাড়ির কাজ শেষ। আরেকটি নির্মাণাধীন।

অভিযোগ উঠেছে, ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে তিনি শতাধিক প্রকারের ওষুধ তৈরি করেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশ যৌন সমস্যার ওষুধ। একেক প্রকার ওষুধের একেক দাম। শুধু মাত্র ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের ওপর ভর করে চলছে কবীর হোসেনের কর্মকাণ্ড। এক কথায় সব কিছু চলছে অবৈধ পন্থায়। আর না বুঝে ভুয়া চিকিৎসক কবীরের কাছে এসে রোগীরা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু পায়না। এছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসের মাধমে ওষুধ পার্সেল করে পাঠিয়ে দেন তিনি। বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা অগ্রিম নেয়া হয়। ওষুধ খাওয়ার পরে যৌন সমস্যার সমাধ্যান না হলেও অনেকে সম্মানের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখেন।

ননী ফল নার্সারির মালিক ডিগ্রি ছাড়াই চিকিৎসক বনে যাওয়া খন্দকার কবীর হোসেন জানান, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ওষুধ তৈরি করেন। মানুষের চিকিৎসা সেবা দেন। তার এখানে কয়েকশ’ প্রকারের বিদেশী গাছ আছে। কোন গাছে কি রোগের কাজ করে এটা তার মুখস্ত। তাই চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে তিনি মানুষের উপকার করছেন।

তিনি আরও জানান, “গাছ কখনো বেঈমানী করতে পারেন না” ফলে তার ওষুধে উপকার না হলেও কারো ক্ষতি করবে না। প্রথমে তিনি বলেন ওষুধ নিয়ে যে যা খুশি হয়ে দেন তিনি সেই টাকা নেন। তিন হাজার টাকা নিচে ওষুধ নেই, রোগীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে এমন অভিযোগে তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ৬শ’ প্রজাতির বিভিন্ন গাছ দিয়ে তিনি ওষুধ তৈরি করেন। ১৮ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিদেশী গাছ দিয়ে তৈরি ওষুধ নিলে টাকা বেশি লাগবে এটা স্বাভাবিক। মানুষের সাথে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. তৌহিদুর রহমান জানান, যৌনতা নিয়ে মানুষের গোপন আগ্রহ এবং আড়ষ্টতা অনেকটাই সহজাত। অনেকেই এ সমস্ত বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। আর ভয়ও পান কেউ কেউ। আর এটাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা জোরদার করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ভায়াগ্রা ইডিগ্রাসহ ভারতীয় যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট গুড়ো করে মিশিয়ে বড়ি ও হালুয়া তৈরি করা হচ্ছে। এ ওষুধ খাওয়ার পর ক্ষণিকের জন্য কাজ সমস্যার সমাধান হয়না। কিন্তু যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘ দিন এই ওষুধ খাওয়ার পর হৃদরোগ, কিডনীসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কবীর হোসেনের তৈরি করা ওষুধের গুণগত মান যাচাই করা উচিত। কারণ তিনি বিদেশী গাছ ও শিকড় দিয়ে ওষুধ তৈরির নামে প্রতারণায় নামতে পারেন। এসব চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত নয়। ননী ফল সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বলে জানান এই চিকিৎসক।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, মানসিক দুর্বলতাকে পূঁজি করে মানুষের সাথে প্রতারণা করে মোটা অংকের টাকা লুফে নেয়া হচ্ছে। কবীরের মতো মানুষের খপ্পড়ে পড়ে অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই সব প্রতারকদের কবল থেকে বাঁচতে মানুষকে সচেতন হতে হবে।

ওষুধ প্রশাসন যশোরের তত্ত্বাবধায়ক নাজমুল ইসলাম জানান, খন্দকার কবীর হোসেন একজন প্রতারক বলে জানতে পেরেছি। তিনি কখনো সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, কখনো চিকিৎসক বলে ননী ফল নার্সারির অন্তরালে মানুষের সাথে প্রতারণা করে চলেছেন। কবীরের প্রতারণার শিকার একজন লিখিত অভিযোগ করেছেন। নাজমুল ইসলাম আরও জানান, ওষুধ তৈরির জন্য কবীর হোসেনের ড্রাগ লাইসেন্স দেয়া হয়নি। তিনি পুরোপুরি অবৈধভাবে ওষুধ তৈরি করছেন। তার ওষুধের মান নিয়ে সন্দেহ আছে। তার প্রতারণার বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর যশোরের সহকারী পরিচালক ওয়ালিদ বিন হাবিব জানান, ননী ফল নার্সারির আড়ালে খন্দকার কবীর হোসেনের চিকিৎসা প্রতারণার বিষয়টি তিনি অবগত। বিগত দিনে এক প্রবাসীর যৌন চিকিৎসার নামে ৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসায় কোনো কাজ না হওয়ার কারণে ভুক্তভোগী কবীর হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। ফলে তাকে ডেকে নিয়ে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। ওই সময় প্রতারণা ব্যবসা বন্ধ করার জন্য কবীর হোসেনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। তার প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস জানান, ডিগ্রি বিহীন ভুয়া চিকিৎসক খন্দকার কবীর হোসেনের চিকিৎসা প্রতারণার বিষয়ে খোঁজ নেয়া হবে। মানুষকে বোকা বানিয়ে অর্থ আয়ের ফাঁদ পরিচালনার সুযোগ দেয়া হবেনা।


Leave a Reply

Your email address will not be published.