ইতালি যাওয়ার পথে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক বর্ণনা

ইতালি যাওয়ার পথে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক বর্ণনা

আমি আবার ফিরে এসেছি বাংলাদেশে। তবে আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় আমার সহযাত্রী ও বন্ধুদের মৃত্যু। ২৫ জনের ধারণ ক্ষমতার বোটে সে দিন ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জন।

এভাবে শুরু হওয়া একটি স্ট্যাটাস শনিবার (৫ মার্চ) বিকেল থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এই স্ট্যাটাসটি পোস্ট করেছেন সৌদি প্রবাসী সৈয়দ মোকতাদির ইসলাম নামে এক যুবক।

শনিবার রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে বেঁচে ফেরা এক যুবকের তথ্য।

ওই যুবকের নাম ইউসুফ মৃধা (২৯)। তিনি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের খোরশেদ মৃধার ছেলে।

সৌদি প্রবাসী সৈয়দ মোকতাদির ইসলাম বলেন, আমার বন্ধু ইউসুফ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে প্রায় এক মাস নিখোঁজ থেকে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন।

সে এখন রাজধানীর হাজী ক্যাম্পে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা আমার কথা হয়েছে। সে যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেছি আমি।

মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে ইউসুফ মৃধা বলেন, ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লিবিয়া থেকে আমাদের বোট ছাড়ে। আবহাওয়া ভালো না তারপরও। বোটে ধারণ ক্ষমতা ছিল ২৫ জন। সেখানে দুই জন চালকসহ ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জন। ডবল ইঞ্জিনের বোট দেওয়ার কথা থাকলেও বোটে ইঞ্জিন ছিল একটি। আমাদের কোনো সেফটি জ্যাকেটও দেয়নি। কারণ লাইফ জ্যাকেট দিলে যাত্রী কম ধরবে। লিবিয়া থেকে রাত ৮টায় যাত্রা শুরু করে ভোর ৩টার দিকে আমরা পৌঁছে যাই মাল্টার কাছাকাছি।

তিনি বলেন, এর মধ্যেই একজন বোট থেকে পানিতে পড়ে যান। সে বলছিল ‘আমাকে তোরা উঠাবি না?’ তখন আমরা সবাই বললাম ক্যাপ্টেনকে (নাবিক) তাকে নিয়ে নিতে। সাগর খুব উত্তাল থাকায় তাকে তুলতে গিয়ে বোট একদিকে কাত হয়ে যায় এবং বোটে পানি উঠতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের বোটটি উল্টে ডুবে যায়।

তারপর আমরা যে যেভাবে পেরেছি যেমন— তেলের গ্যালন এটা-ওটা ধরে সাঁতার কাটতে থাকি। কিছুক্ষণ পর বোটটি একটু দূরে ভেসে ওঠে। আমরা ১৫-২০ জন উল্টে যাওয়া বোটটি ধরি দুপাশ থেকে। ওই সময় অন্ধকারের কারণে দেখা সম্ভব ছিল না সেখানে কে আছে আর কে নেই। এ অবস্থায় প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে ভাসতে থাকি কোনো ভাবে। এর মধ্যে আমাদের শরীর বরফ হয়ে আসছিল। ঢেউয়ের কারণে এক একজন ছুটে যাচ্ছে বোট থেকে। চোখের সামনে হাতের মধ্যেই মৃত্যু হচ্ছে কারও কারও। লবণাক্ত পানি খেয়ে ফেলায় কয়েকজনের মুখ দিয়ে রক্ত আসছিল। আস্তে আস্তে অনেকে পানির নিচে চলে যাচ্ছিল আমাদের দিকে বড় বড় চোখ করে।

ইউসুফ বলেন, এমন করতে করতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা কেটে গেল। ২৮ জানুয়ারি বিকেল হয়ে গেছে। তখন বেঁচে ছিলাম আমরা মাত্র সাত জন। তখন অনেক দূর দিয়ে একটি টহল কোস্টগার্ডের বোট যাচ্ছিল। তারা দেখতে পায় আমাদের এবং উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর সাত জন থেকে রাশিদুল নামে একজনের মৃত্যু হয়। আমাদের ছয় জনকে অজ্ঞাত এক জেলখানায় তিন দিন রাখা হয়। তিন দিন পর আরেকটি জেলখানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে গত বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) স্থানীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় দুজন দেশে ফিরেছি। অন্য চার জনও দ্রুতই দেশে ফিরবেন বলে শুনেছি।

মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরা ছয় জনের মধ্যে ইউসুফসহ দুজন বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরা অন্যজন ফরিদপুরের নগরকান্দার মো. ইউনুস শেখের ছেলে শেখ সামিউল (১৮)। বর্তমানে তারা রাজধানীর হাজী ক্যাম্পে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নরসিংদীর মোট ১৫ জন নিখোঁজ আছেন। তারা হলেন— রায়পুরার ডৌকারচরের নাদিম সরকার (২২), আলমগীর সরকার (৩৫), আল-আমিন ফরাজী (৩৩), দক্ষিণ মির্জানগরের এস এম নাহিদ (২৫), আমিরগঞ্জের ইমরান মিয়া (২১), আশিস সূত্রধর (২১), সবুজ মিয়া (২৫), হাইরমারার শাওন মিয়া (২২), সেলিম মিয়া (২৪) ও বেলাব উপজেলার আল আমিন (২৮), নারায়ণপুরের মতিউর রহমান (৩৭), সল্লাবাদের শরীফুল ইসলাম (২৪), সালাউদ্দিন (৩২), মো. হালিম (২৬), বিপ্লব মিয়া (২৪)। বাকি ১৩ জন ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর ও সিলেট জেলার বাসিন্দা। তাদের নাম জানা যায়নি।

কথা হয় রায়পুরার হাসনাবাদ গ্রামের নিখোঁজ আল আমিন ফরাজীর ছোটবোন ইভা আক্তার ইতির সঙ্গে। তিনি বলেন, ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে বাংলাদেশের তিন দালাল তারেক মোল্লা, তার সহকারী রাজিব ও মনিরের ওপর ভরসা করে আমার ভাই গত নভেম্বরের শেষ দিকে বাড়ি থেকে যায়। ৮ লাখ দিয়েছি আগেই। বাকি দুই লাখ টাকা পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সর্বশেষ ফোনে কথা হয়েছে। বোটে উঠবে, দোয়া চেয়েছিল। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই।

দালাল রাজিব ও তারেক বাংলাদেশ থেকে লোক জোগাড় করেন আর মনির লিবিয়া থেকে কাজ করেন বলে তিনি জানান। তাদের বাড়ি রায়পুরা উপজেলায়। নরসিংদীতে বাকি যারা নিখোঁজ তারা সবাই এই তিন দালালের মাধ্যমেই গিয়েছিলেন। দালালদেরও এখন খোঁজ নেই বলে জানান ইতি।

এ বিষয়ে নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া বলেন, মৃত্যুঝুঁকি থাকার পরও দালালদের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা কমছে না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিবেচনা বোধের অভাব থেকেই অনেক তরুণ-যুবক এত ঝুঁকি নেন। এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান জানান, দুঃখজনক বিষয়টি এই মাত্র শুনলাম। এছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কোনো সদস্যও আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানাননি। এ বিষয়ে কতটুকু কি করা সম্ভব, তা খোঁজ নিয়ে দেখব। স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুত্রঃ ঢাকা পোস্ট


Leave a Reply

Your email address will not be published.