রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১৩ কোটি টাকা দিতে চান সেই চেয়ারম্যান

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১৩ কোটি টাকা দিতে চান সেই চেয়ারম্যান

সংবাদ: গত সাত বছর ধরে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছেন ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খান। এত দিন ধরে নদী থেকে বালু উত্তোলন করলেও সরকারকে কোনো রাজস্ব দেননি তিনি।

এবার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা জমা দেয়ার আবেদন করেছেন চেয়ারম্যান সেলিম খান। এ বিষয়ে কর্তব্যরত ব্যক্তিরা বলছেন,

সেলিম খানকে নির্দিষ্ট একটি মৌঝায় বালু উত্তোলনের আদেশ দিলেও তা বিক্রির অনুমতি দেননি আদালত। আর আদালত বালু উত্তোলনের অনুমতি দিলেও কিছু বিধিনিষেধ থাকে।

এক্ষেত্রে তিনি বিধিনিষেধ পালন না করে অপরিকল্পিত ভাবে বালু উত্তোলন করার ফলে বেড়েছে নদীভাঙন। সেই সঙ্গে ইলিশসহ মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

এমন পরিস্থিতিতে বালু উত্তোলন রোধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে জেলা প্রশাসন কিন্তু অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যেতে তদবির করে যাচ্ছে সেলিম এন্টারপ্রাইজের মালিক চেয়ারম্যান সেলিম খান।সবশেষ বালু উত্তোলন বৈধ করতে সরকারি রয়্যালটি,

ভ্যাট ও আয়কর বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১৩ কোটি টাকা ৭১ লাখ টাকা জমা দেওয়ার আবেদন করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর বলছে, আদালতের যে আদেশে চেয়ারম্যান সেলিম খান বালু উত্তোলন করছেন,

সেখানে তাকে বালু বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবু তিনি বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ বালু বিক্রি করেছেন। এখন তিনি অন্য এক ব্যক্তির মামলায় আদালতের আদেশ দেখিয়ে এখন টাকা জমা দিতে চাইছেন। যা আদালত অবমাননার শামিল ও আইনের লঙ্ঘন।

সরকারি সম্পদ রক্ষায় জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যেই গত ২২ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে টাকা জমাদানের আবেদন করেন সেলিম খান। ওই আবেদন সূত্রে জানা গেছে, সেলিম খান বালু উত্তোলনে সরকারি রয়্যালটি, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নয় কোটি ১৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা জমাদানের আবেদন করেছেন। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে আরও চার কোটি ৫৭ লাখ টাকা জমা দেওয়ার আবেদন করেছেন।

জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া সেলিম খান আবেদনে উল্লেখ করেন, হাইকোর্ট বিভাগের ৫০৭৮/২০১৪ নম্বর রিট পিটিশন মামলায় ২০১৪ সালের ১০ জুন দেওয়া আদেশে প্রতি ঘনফুট বালু উত্তোলনের জন্য রয়্যালটি বাবদ সরকারি রাজস্ব খাতে জেলা প্রশাসক বরাবর ২৫ পয়সা হারে এবং বিআইডব্লিউটিএ বরাবর ১৫ পয়সা হারে রয়্যালটি জমাদানের নির্দেশনা রয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ২০১৯ সালের ২০ মার্চ ৩০ কোটি ৮৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের কার্যাদেশ দিলেও রয়্যালটি, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ টাকা জমাদানের জন্য চিঠি দেওয়া হয়নি। তাই আদালতের আদেশ অনুসরণ করে ৩০ কোটি ৮৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের সরকারি রয়্যালটি বাবদ জেলা প্রশাসক বরাবর ২৫ পয়সা হারে সাত কোটি ৬২ লাখ দুই হাজার ৫০০ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ এক কোটি ১৪ লাখ ৩০ হাজার ৩৭৫ টাকা এবং ৫ শতাংশ আয়কর বাবদ ১০ হাজার ১২৫ টাকাসহ নয় কোটি ১৪ লাখ ৪৩ হাজার সরকারের রাজস্ব খাতে জমাদানের আবেদন করছি।

এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিষয়ে জবাব চেয়ে সেলিম খানকে পাল্টা চিঠি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭৫৪৫/২০১৫ রিট পিটিশনের ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিলের আদেশে হাইকোর্ট আপনাকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিলেও বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন কিনা তা উল্লেখ করেননি। আদালত কিংবা ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ-সহ কোনও সরকারি সংস্থা বালু বিক্রির অনুমতি না দিলেও কীভাবে সরকারি বালু বিক্রি করে অসাধুভাবে লাভবান হচ্ছেন, তার উত্তর জানা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসকের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১-এর ১০ (৫) বিধিতে বলা হয়েছে, কার্যাদেশে ইজারাগ্রহীতা কর্তৃক পরিশোধিতব্য সমুদয় মূল্য উল্লেখ থাকবে। ইজারাগ্রহীতাকে কার্যাদেশ প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে ওই সমুদয় অর্থ (ভ্যাট, আয়কর এবং সরকার নির্ধারিত অন্যান্য করসহ) জমা দিতে হবে। আপনার আবেদনে উল্লেখ আছে, জেলা প্রশাসক ২০১৯ সালের ২০ মার্চ উল্লেখিত মৌজায় ৮৬.৩০ লাখ ঘনমিটার বালু উত্তোলনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। ওই পত্রের সাত কার্যদিবস গিয়ে তিন বছর ১১ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আপনি রয়্যালটি জমা দিতে চাচ্ছেন। এত বছর পর রয়্যালটি জমা দেওয়ার আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম খান বলেন, ‘এসব বিষয়ে পরে কথা বলি। এটা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। পরে কথা বলবো’—বলে ফোন রেখে দেন।

এ বিষয়ে চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা কায়সারুল ইসলাম বলেন, সেলিম খান যে বালু উত্তোলন করছেন তার রয়্যালটি, ভ্যাটসহ চার কোটি ৫৭ লাখ টাকা জমা দেওয়ার আবেদন করেছেন। বালু উত্তোলন শুরুর এত বছর পর কেন টাকা জমা দেওয়ার আবেদন করলেন তিনি, এমন প্রশ্নের জবাবে কায়সারুল ইসলাম বলেন, সেটি আমি বলতে পারবো না। এখানে টাকার কোনও বিষয় ছিল না। এখন কীসের ভিত্তিতে টাকা জমার বিষয়টি এলো এমন প্রশ্নের জবাবে কায়সারুল ইসলাম বলেন, বোরহান খান নামে এক ব্যক্তি নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য মামলা করেছিলেন। ওই মামলার আদেশে বলা আছে, বিআইডব্লিউটিএ প্রতি ঘনফুট ১৫ পয়সা হারে এবং জেলা প্রশাসন ২৫ পয়সা হারে রয়্যালটি গ্রহণ করবে। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেলিম খান টাকা দিতে চাইছেন। তবে তার ওই মামলায় এমন কোনও আদেশ নেই। সেজন্য আমি বলেছি, টাকা জমা নিতে পারবো না। আপনি আবেদন করলে ঢাকায় পাঠাবো। আমাদের আইন উপদেষ্টার মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ২০১৪ সালে আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বোরহান খান নামে একজনের সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে তিন বছরের জন্য একটি চুক্তি করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। তখন বোরহান খানকে বলা হয়েছিল, এত টাকা জেলা প্রশাসক ফান্ডে, এত টাকা বিআইডব্লিউটিএ’র ফান্ডে এবং এত টাকা ভ্যাট দেবেন। বালু উত্তোলনের জন্য কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেলিম খান মামলা করেছেন ২০১৫ সালে। তাই তার বিষয়টি আলাদা। কাজেই ওই মামলার সূত্র ধরে এই মামলার টাকা জমা দেবে সেটি বললে তো গ্রহণযোগ্য হবে না। এখন সেলিম খান সেই চুক্তির রেফারেন্স দিয়ে আবেদন করেছেন, রয়্যালটি জমা দেওয়ার জন্য, আমরা তাকে বলেছি, আপনার সঙ্গে আমাদের কোনও চুক্তি নেই। আপনাকে সরকার বালু বিক্রির অনুমতি দেয়নি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আপনি এত টাকা জমা দেবেন। এসব বিষয়ে আমরা তার বক্তব্য জানতে চেয়েছি।

এ পর্যন্ত তাকে রয়্যালটি জমা দেওয়ার জন্য কোনও চিঠি দেওয়া হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, তার সঙ্গে আমাদের কোনও চুক্তি নেই। এমনকি বালু বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি। আদালত থেকে সেলিম খান বালু উত্তোলনের অনুমতি নিয়েছেন। তার মানে এই নয় যে তাকে বালু বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমতি ছাড়া বালু বিক্রি করা এক ধরনের চুরি। এছাড়া যখন কাউকে অর্ডার দেওয়া হয়, সেখানে অনেক শর্ত থাকে। এখানে সবই লঙ্ঘন করেছেন সেলিম খান। উল্লেখ্য, নদীভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর ও স্থানীয়রা বিরোধিতা করলেও বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে প্রভাবশালী ওই চক্রটি। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.