তরমুজ বিক্রিতে ডিজিটালের চোঁয়া! কেজি দরে ১৩০ টাকার তরমুজ ৫০০ টাকা

তরমুজ বিক্রিতে ডিজিটালের চোঁয়া! কেজি দরে ১৩০ টাকার তরমুজ ৫০০ টাকা

বাংলাদেশ: চাকরিজীবী ইসরাত তামান্না বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজারের সাতটি দোকান ঘুরেও কিনতে পারছিলেন না তরমুজ। যে দোকানেই যাচ্ছেন, সেখানেই বলছে,

কেজি ৫০ টাকা। এমনকি একেবারে ছোট আকৃতির তরমুজও বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। এক পর্যায়ে তিনি তরমুজ কিনবেন নাকি কিনবেন না এ ভাবনায় পড়ে যান।

পাশেই ঢাকা পোস্টের এ প্রতিবেদককে দেখে অনেকটা আগ্রহ নিয়েই ইসরাত তামান্না বলেন, খুচরা বিক্রেতারা অনেক উঁচু মূল্যে তরমুজ বিক্রি করছেন। দোকানিরা সাংবাদিকদের ক্যামেরা বা প্রশাসনের লোক দেখলেই

কেবল বলে পিস হিসেবে বিক্রির কথা। বাস্তবতায় তারা পিস হিসেবে কোনো তরমুজ বিক্রি করেন না, সব ব্যবসায়ীই কেজি দরে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছে যেন ক্রেতারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

শুধু ইসরাত তামান্না নন, বছরে প্রথম তরমুজ কিনবেন এমন উৎসাহ নিয়ে এসেছিলেন রাকিব। অনেকক্ষণ বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে একটিও কিনতে পারেননি। আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন,

আগে ইলিশ মাছ কিনতে হলে ঘুষের টাকার দরকার ছিল। এখন দেখেছি তরমুজ কিনতে হলেও ঘুষের টাকা লাগবে। এই ক্রেতা আরও বলেন, কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করা ক্রেতা ঠকানোর একটি কৌশল। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে সহজে বেশি টাকা আয় করতেই এমন ফাঁদ পাতেন বিক্রেতারা।

ক্রেতাদের এমন অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেল। চৌমাথা বাজারেই কেজি দরে বিক্রি করছিলেন শাহাদাৎ হোসেন। ঢাকা পোস্টের ক্যামেরায় তিনি অস্বীকার করে বলেন, অনেকে কেজি দরে বিক্রি করলেও আমি পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি করি। তার এই কথাকে ক্রেতা ইসরাত তামান্না চ্যালেঞ্চ করলে পরক্ষণেই স্বীকার করেন, ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করছেন তিনি।

শাহাদাৎ বলেন, কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করা প্রতারণা। আমরা শতক হিসেবে আড়ত থেকে কিনে এনে কেজি দরে বিক্রি করছি বেশি টাকা আয়ের জন্য। আরেক বিক্রেতা রনি বলেন, কেজিতে বিক্রি করলে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা কম বলতে হয়। যে তরমুজটির ক্রয়মূল্য ১৩০ টাকা, সেটি পরিবহন, আড়তদারি খরচ দিতে হয়। এ জন্য একটি তরমুজ ১৩০ টাকায় কিনলেও কমপক্ষে ২৫০ টাকায় বিক্রি করলে কিছুটা লাভ হয়। পিস হিসেবে বিক্রি করতে গেলে ১৩০ টাকার তরমুজ ক্রেতারা ১০০ টাকাও দাম বলেন না।

১৫ বছর ধরে তরমুজ ব্যবসা করেন মোজাম্মেল খান। তিনি বলেন, অল্প কয়েক বছর ধরে তরমুজ কেজিতে বিক্রি করছি। কেজিতে বিক্রি করলে ক্রেতাদের সঙ্গে কম কথা খরচ করতে হয়। এ বছর ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি। আমরা তো লাভ করতে পারি না, লাভ করেন কৃষক। তারা এক সিজনে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ঘরে ফেরেন। ব্যবসায়ী আসলাম সিকদার বলেন, কেজি দরে বিক্রি করলে ক্রেতাদের লাভ। কারণ, একটি তরমুজের ওজন আছে পাঁচ কেজি কিন্তু বিক্রেতা দাম চাইল সাত কেজির। তখন ক্রেতা সঠিকভাবে কিনতে পারল না। এ জন্য কেজিতে বিক্রি করা ক্রেতাদের জন্য ভালো।

নগরীর নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, বাংলাবাজার, পোর্টরোড, নতুন বাজার, কাশিপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে গত বছরের মতো এ বছরও কেজি দরে তরমুজ বিক্রি চলছে দেদার। শুধু বিভিন্ন বাজারেই নয়, ভ্যানে ফেরি করে তরমুজ বিক্রিও হচ্ছে কেজি দরে। কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় বেশি তরমুজ উৎপাদিত হলেও খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ায় বাজারে। এরপর অস্থির করে তোলে মৌসুমি এই ফলের বাজার। ফলে কম আয়ের ক্রেতারা ভোগ করতে পারে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি বরিশালের অতিরিক্ত উপপরিচালক তাওফিকুল আলম জানান, চলতি মৌসুমে (২০২১-২২) বিভাগের ৬ জেলায় ৪৬ হাজার ৪৫১ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। যা গত মৌসুমের (২০২০-২১) চেয়ে ১১ হাজার ৭৬৩ হেক্টর বেশি। কারণ বিগত মৌসুমে ছয় জেলায় ৩৪ হাজার ৬৮৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। মৌসুমে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলায়। তুলনামূলক কম চাষ হয়েছে বরিশাল, পিরোজপুর এবং ঝালকাঠি জেলায়। এর মধ্যে পুটয়াখালীতে ২২ হাজার ৮৯০ হেক্টর, বরগুনায় ১১ হাজার ৫১২ হেক্টর, ভোলায় ১১ হাজার ২৪৯ হেক্টর, বরিশালে ৬৪৬ হেক্টর, পিরোজপুরে ১০৬ হেক্টর এবং ঝালকাঠিতে ৪৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চালতাবাড়িয়ার বাসিন্দা তরমুজচাষি নান্না গাজী বলেন, আমরা ক্ষেত থেকে আড়তে শতক হিসেবে তরমুজ বিক্রি করি। ১৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত শতক বিক্রি করি। কিন্তু খুচরা বাজারে যেসব বিক্রেতা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করেন, তারা সঠিক কাজ করছেন না। এটা করা উচিত না।

তরমুজচাষি ইউসুফ সিকদার বলেন, আমরা পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি করি। কিন্তু যারা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করেন তারা ভালো কাজ করেন না। তারা মানুষ ঠকান। চরকাজলের তরমুজচাষি শাহজাহান মাঝি জানান, ৬ থেকে ৭ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এর থেকে বড় যেমন ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় এবং ১০ থেকে ১৫ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। পোর্ট রোডে তরমুজ ক্রেতা মাসুম শরীফ বলেন বলেন, ৬ থেকে ৭ কেজি ওজনের একটি তরমুজ ১৩০ টাকায় বিক্রি করছি। সেটি যখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে ক্রেতারা কিনছেন, তখন তরমুজটির দাম হয় ৫০০ টাকার কাছাকাছি। অথচ দক্ষিণাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তরমুজ উৎপাদিত হয়। সেই অঞ্চলে যদি এত দাম হয়, তাহলে দেশের অন্য স্থানে তরমুজ তো সোনার হরিণে রূপ নিয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উচিত এখন থেকেই অভিযান শুরু করা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বাজারে তরমুজ উঠতে শুরু করেছে। আমরা ওয়াকিবহাল রয়েছি যে তরমুজ কৃষকরা শতক হিসেবে বিক্রি করেন। কোনো খুচরা বিক্রেতা যেন ক্রেতাদের ঠকিয়ে কেজি দরে বিক্রি করতে না পারেন, সে জন্য আমরা শিগগিরই অভিযান শুরু করব। তবে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন বাজারে বিক্রেতাদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে যেন তারা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি না করেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.