এটি একটি বিশৃঙ্খল মহানগরের নাম

এটি একটি বিশৃঙ্খল মহানগরের নাম

গল্প, কবিতা কিংবা গানে ঢাকাকে অনেকেই ভালোবেসে ‘প্রাণের শহর’, ‘জাদুর শহর’, ‘স্বপ্নের শহর’ বা ‘

তিলোত্তমা নগর’— এমন নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে থাকেন। আদতে বসবাসের দিক থেকে এখন শহরটির অবস্থা শোচনীয় বললেও কম বলা হবে।

যদি সুস্থ-সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের প্রসঙ্গ আসে, সেই বিবেচনায় ঢাকা অনেক আগেই সে যোগ্যতা হারিয়েছে। এই মহানগরের বাতাস আগের চেয়ে অনেক বেশি বিষাক্ত,

অনেক এলাকার পানি দূষিত, সারাদিন দুর্বিষহ যানজট, অসহ্য শব্দদূষণ, ঘনবসতি– সব মিলিয়ে এটি বসবাসের অযোগ্য একটি শহরে পরিণত হয়েছে। প্রায় ২ কোটি

জনসংখ্যার এই নগরকে বসবাসের অযোগ্য এবং বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর উল্লেখ করে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ঢাকাকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেছেন।

ঢাকাকে দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু করতে গিয়ে এককালের ‘তিলোত্তমা’ এই নগর অপরিকল্পিতভাবে আকাশছোঁয়া দালানকোঠায় ভরে গেছে। পুরো শহর যেন পরিণত হয়েছে বড় একটি বাজারে।

আদর্শ বৈশ্বিক মানের নিরিখে এই শহরের যাতায়াত, পয়োনিষ্কাশন, আবাসন, জ্বালানি, পানিসহ প্রাত্যহিক জীবনঘনিষ্ঠ অতিপ্রয়োজনীয় খাতগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। পরিবেশগত বিভিন্ন র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দেখলেই এই ভয়াবহ চিত্রটি বোঝা যায়।

২০২১ সালের এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্টে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। দূষিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম। রাজধানী ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ক্ষতিকর উপাদান পিএম-২.৫ এর গড় মাত্রা ৭৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৫ গুণ বেশি।

যানবাহন, কলকারখানা, ইট ভাটার ধোঁয়া এবং ধুলোবালির কারণে শহরটি গত বেশ কয়েক বছর ধরে বায়ুদূষণের চরম মাত্রায় পৌঁছে যাওয়া শহরগুলোর তালিকার প্রথম দিকে থাকছে। পাশপাশি ঢাকার পানীয় জল দূষণের বিষয়টিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসা পানি বিষাক্ত ধাতু, কলিফর্ম এবং অন্যান্য জৈব ও অজৈব পদার্থের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানিও যে দূষিত, তা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনেই উঠে এসেছিল। ওই প্রতিবেদনে ওয়াসার ১০টি মডস জোনের মধ্যে ৪টি এবং ৪ উত্স পয়েন্টের মধ্যে ২টিতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনটি হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছিল মন্ত্রণালয়। এতে ওয়াসার ৩৪টি জায়গার পানির নমুনা পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১০টি মডস জোনের প্রতিটি থেকে ৩টি এবং ৪ উত্স পয়েন্টের প্রতিটির ১টি নমুনা নেওয়া হয়। ৩৪ নমুনার ৮টিতেই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মেলে।

সে বছর ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানায়, ত্রুটিপূর্ণ পাইপলাইনের কারণে ৫৭টি এলাকার পানি দূষিত হয়েছে। গত ২-৩ বছরে ঢাকার পানীয় জল নিয়ে তেমন অভিযোগ না পাওয়া গেলেও, সম্প্রতি রাজধানীতে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। এর জন্য ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আংশিক দায়ী। এদিকে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং শহরের ভেতরে ও আশেপাশের নদী ও খালের পানি দূষণের শিকার হচ্ছে। এদিকে এই শহরের আরেক নীরব ঘাতক হলো শব্দদূষণ। এর কারণে রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকায় শব্দের মাত্রা সহনীয় মানের দ্বিগুণ এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ নগর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার গড় শব্দের মাত্রা ১১৯ ডেসিবল। এ মাত্রা বিশ্বের ৬১টি বড় শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুযায়ী, যানবাহন চলাচল করার ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় অনুমোদনযোগ্য শব্দের মাত্রা ৫৫ ডেসিবল এবং বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবল। যানবাহন চলাচল, নির্মাণকাজ কিংবা লাউডস্পিকার বাজিয়ে শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। উচ্চ মাত্রার শব্দ শ্রবণশক্তি হ্রাস করে, পাশাপাশি অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টি করে।

এছাড়া নগরবাসীকে প্রতিদিন যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা হলো দুর্বিষহ যানজট। বিশ্বের সব মেগাসিটির ক্ষেত্রেই দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ট্র্যাফিক জ্যাম থাকবে, এটা বেশ সাধারণ ঘটনা। কিন্তু ঢাকা এর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ শহরের সড়কে সারাদিনই বিশৃঙ্খলা থাকে এবং ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। ইউজার-কন্ট্রিবিউটেড ডাটাবেস নামবিওর ২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড ট্র্যাফিক ইনডেক্সে দুর্বল ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বিশ্বের ২২৮টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১০ম। এর প্রধান কারণ সড়কের স্বল্পতা এবং অদক্ষ ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা। এছাড়াও নির্ভরশীলতা, স্বাচ্ছন্দ্য, গতি ও নিরাপত্তার দিকে থেকে ঢাকার বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থা জনগণের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আমাদের প্রিয় এই নগরীর সমস্যার তালিকা এখানেই শেষ নয়।
সামান্য বৃষ্টিতেই এ শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধভাবে জলাভূমি ও জলাশয় দখল এবং ড্রেনে ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহরের বেশিরভাগ রাস্তা সারাদিন পানিতে ডুবে থাকে। এদিকে খোলা জায়গার অভাব, পার্ক, খেলার মাঠ ও গাছপালার স্বল্পতা ঢাকাকে ধূসর ও নিস্তেজ এক নগরীতে পরিণত করেছে। তাহলে উপায়? নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে ঢাকাকে টেকসই শহর করতে হলে সরকারকে বাস্তবসম্মত, জনমুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে দূষণ কমাতে হবে, সড়ক ও ট্র্যাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে, গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে বলে তারা মনে করেন।

এছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অংশীদারদের জবাবদিহি করার মাধ্যমে এটা করা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিবের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘শহরকে বসবাসের উপযোগী করে তোলা সম্ভব। ২-৩ বছরের মধ্যেই বায়ু ও শব্দ দূষণ প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব।’ এ ক্ষেত্রে আধুনিক যুগোপযোগী পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও শব্দদূষণ বিষয়ক গবেষক এ বি এম বদরুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ শহরটা যেভাবে চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এসব দেখভাল করার কেউ নেই। পুরো ঢাকাই নোংরা। আমি কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। বেশ কিছু আইন থাকলেও, সেগুলোর প্রয়োগ করা হয় না বললেই চলে।’ ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করতে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই গবেষক আরও বলেন, ‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে নেওয়া দরকার, তা হলো বিকেন্দ্রীকরণ।’ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল হক বলেন, ‘শহরকে বসবাসের উপযোগী করতে পরিবর্তনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’ ঢাকাকে ‘বিক্ষিপ্ত উন্নয়নের’ শিকার একটি মহানগর হিসেবে অভিহিত করে এর জন্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এ শহরকে বসবাসের উপযোগী করতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। আর এর জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের সৎ উদ্দেশ্য, পাশাপাশি এ ব্যাপারে সরকারকে দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে হবে।’


Leave a Reply

Your email address will not be published.