ইমরান খানের ক্ষমতা হারানোর ‘পাঁচ কারণ’


’নয়া পাকিস্তান’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।

কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে মাঝপথেই ভেঙে গেল। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ হলেও পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এটা ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’র (পিটিআই) বড় ব্যর্থতা। আর এর পেছনে অন্তত পাঁচটা কারণ রয়েছে।

ইমরান খানের ক্ষমতা হারানোর ‘পাঁচ কারণ’
এক. এস্টাবলিশমেন্ট তথা সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঝামেলাসেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলা পিটিআই’র জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ ছিল। কারণ দলটির জন্মই সেনাবাহিনীর হাতে।

২০১১ সালে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাবাহিনী পিটিআইকে শুধু পুনর্জন্মই দেয়নি, তাকে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালীও করে। পিটিআই‘র ক্ষমতার পথ ছিল লালগালিচায় মোড়া।

সেনাবাহিনীর শতভাগ সমর্থন নিয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিজের মেয়াদ শুরু করেন ইমরান খান। যা এর আগে পাকিস্তানের খুব কম নেতাই উপভোগ করেছে।

তা সত্ত্বেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একের পর এক ঝামেলা পাকাতে থাকেন পিটিআই নেতা।এর ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে এবং অবশেষে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র মহাপরিচালক পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের জেরে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

পিটিআই’র প্রত্যেকেই জানতেন যে, তাদের ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে যদি কারও ভূমিকা থেকে থাকে তাহলে সেটা এই সেনাবাহিনীই। আবার কেউ যদি তাদেরকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বা তারও বেশি সময় ক্ষমতায় রাখতে পারে, সেটাও এই সেনাবাহিনীই। তারপরও পিটিআই নেতৃত্ব সেনা সম্পর্কের বিষয়টি রীতিমতো খেলা করেছেন। এখন অবশ্য দলটির নেতাকর্মীরা ভাবনার প্রচুর সময় পাবেন, কোন কোন সিদ্ধান্তের কারণে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিষিয়ে উঠল। এ জন্য কারা দায়ী, কেন দায়ী তা-ও তারা চাইলে বের করতে পারবেন।

দুই. বিরোধীদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে অস্বীকার বিভাজনমূলক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি পিটিআই’র মজ্জাগত। বিরোধী দলে থাকার সময় যা ভালোই কাজে এসেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দলটির উচিৎ ছিল সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলা। একইভাবে উচিৎ ছিল বিরোধীদের সঙ্গে একটা কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা। যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে একটা মাত্রা পর্যন্ত প্রশমিত রাখতে পারত। এতে একদিকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা সহজ হতো, আরেকদিকে জনগণকে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণেও মনোযোগ দেওয়া যেত। কিন্তু পিটিআই সুশাসনের বল থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ভুল টার্গেটের পেছনে ছুটতে শুরু করে। পরিস্থিতির ভূল মূল্যায়ন থেকে দলটি কখনই বের হয়ে আসতে পারেনি। যার কারণে তারা প্রতিশ্রুতি ও কাজের মধ্যে সমন্বয় করে উঠতে পারেনি।

তিন. বাজদার বিড়ম্বনা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ওসমান বাজদারকে বেছে নিয়েছিলেন ইমরান খান। প্রথম দিকে এটা বেশ আগ্রহোদ্দীপকই ছিল। কিন্তু এটা স্পষ্ট হতে খুব বেশি সময় নেয়নি যে, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নয় বাজদার। সঙ্গে সঙ্গেই ভুলটা শুধরে নিতে পারতেন ইমরান খান। কিন্তু তার একগুঁয়েমির কারণে ভুলটি শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের দিকেই গড়ায়। এরপর যতই সময় গড়ালো বাজদার বিড়ম্বনা বহুবিধ সংকট নিয়ে হাজির হল। যেমন, ক. সেনাবাহিনীর সঙ্গে পিটিআই’র সংঘাতের সূচনা এখান থেকেই শুরু এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও খারাপ থেকে খারাপ হতে থাকে; খ. সরকার পরিচালনা প্রশ্নেও প্রদেশটির পরিস্থিতি সাবেক শাহবাজ শরিফের আমলের চেয়ে খারাপ হতে থাকে; গ. এর ফলে দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাও খারাপ হতে থাকে। এভাবে একদিকে দলের মধ্যে উপদলীয় কোন্দলের জন্ম হয়। আরেকদিকে দলের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে দিনের পর দিন নিজেদের সমস্যাগুলোর সমাধান না পেয়ে অনেকে দল ছেড়ে চলে যায়। বাজদার বিড়ম্বনা শুরুতেই এড়ানো যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন আর এড়ানোর সুযোগ থাকল না তখন এটাই পিটিআই’র ব্যর্থতার অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠল। ঘটনা হলো, শেষ পর্যন্ত ইমরান বাজদারকে সরিয়ে দিলেন। কিন্তু ততদিনে তার গদি টলমল হয়ে উঠেছে।

চার. অযোগ্যদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন ভোটের সময় পিটিআই জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আর সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যেসব লোককে দায়িত্ব দিয়েছে তা আসলেই কল্পনার বাইরে। ইমরানের মন্ত্রিসভা হল স্মরণকালের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল লোকদের নিয়ে গঠিত। এটা ইমরানও হয়তো বুঝতেন। না হলে তিনি গত চার বছরে বারবার মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস করতেন না। ড. সানিয়া নিশতার বা ড. ফয়সল সুলতানের মতো কিছু ব্যতিক্রম হয়ত মন্ত্রিসভায় ছিলেন। কিন্তু ইমরানের মন্ত্রিসভার অধিকাংশই ছিলেন দায়িত্ব পালনে অক্ষম। আরও বাজে ব্যাপার হলো, নিজেদের মন্ত্রণালয়ের কাজে মনোযোগী হওয়ার চেয়ে তারা বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়েই লিপ্ত ছিলেন। এই মন্ত্রিসভা নির্বাচন ও ব্যবস্থাপনাই ইমরান খান সরকারকে ব্যর্থ করে দিল। যার কয়েকটি কারণ হলো- ক. ইমরান যে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন সে সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা থাকলেও সুনির্দিষ্ট ও সংহত কোনো ধারণা এই মন্ত্রিসভার ছিল না। এ কারণে আমলাদের তৈরি কিছু অদ্ভুত স্কিম ও প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তারা এমন তৎপরতা দেখায়, যাতে মনে হয় মন্ত্রীরা বসে নেই, কিছু একটা করছেন। খ. অর্থ, পররাষ্ট্র, জ্বালানি ও তথ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে হরহামেশা বদল ঘটতে থাকে। যার ফলে এ ক্ষেত্রগুলো অব্যাহতভাবে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। গ. বিমান, মানবাধিকার ও জবাবদিহি সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে, আবার ভয়াবহ পারফরম্যান্স সত্ত্বেও এ সময়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে সরকার পরিচালনার সংকট আরও তীব্র হয়। ঘ. এসব কারণে সরকারের ভাবমূর্তিতে একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয় যা সরকারের বিভিন্ন মুখপাত্রের দুর্বল ও নেতিবাচক যোগাযোগের কারণে।

পাঁচ. আবোলতাবোল বকবকানি ও ঔদ্ধত্যপিটিআই নেতাদের নিজেদের সম্পর্কে হামবড়া ভাব এবং ক্ষমতা নিয়ে একটা ভুয়া আত্মবিশ্বাস দলটির ব্যর্থতার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ফ্যাক্টর বা নির্ধারক। পিটিআইর প্রতিটি সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতিতে অন্য সবার প্রতি একটা ঘৃণার মনোভাব দেখা গেছে। এটা দলটির শরীরে এমন এক বিষাক্ত, বিতৃষ্ণা ও প্রত্যাখ্যানের জীবাণু ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা দলটিকে প্রায় অথর্ব করে তোলে। এর ফলে যখন সবাইকে নিয়ে সরকারের ব্যাপারে একটা সুনাম তৈরি করা এবং দলের মধ্যে আশা জাগানোর মতো কিছু করার প্রয়োজন ছিল তখন তারা তা করতে ব্যর্থ হয়। ঔদ্ধত্য এমন একটা বিষয়, যা কেউই অন্য কারও মধ্যে দেখতে চায় না। আর এ বৈশিষ্ট্যটি যখন একটা রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক প্রকৃতি হয়ে দাঁড়ায় তখন সমগ্র সমাজ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, যখন ক্ষমতাসীন কোনো দলের আচরণে ঔদ্ধত্য ও আবোলতাবোল বকবকানি যুক্ত হয় তখন এমন এক ভয়ংকর পরিস্থিতির জন্ম হয়, যা আর সংশোধন করা যায় না। পিটিআই এমন আচরণকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের বারোটা বাজিয়েছে; নিজের ভাবমূর্তিরও বারোটা বজিয়েছে। আজকে যখন দলটি ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের দ্বারপ্রান্তে, তখন সে এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে পারে।

পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন জামির হোসেন


Leave a Reply

Your email address will not be published.