যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি ছড়িয়ে গেছে তৃণমূল পর্যন্ত, এ দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে!


‘একের পর এক ঘটনা কিন্তু আমাদের হৃদয়কে ভেঙে দিচ্ছে। এই সরকারের আমলে এ ধরনের ঘটনার মাত্রা যে বাড়বে,

তা তো আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে কল্পনাও করিনি। উন্নয়ন হচ্ছে, যু’দ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, কিন্তু মানসিকতার জায়গায়

যুদ্ধাপরাধীরা যা লালন করে, তাই ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের রাজনীতি প্রকাশ্যে নেই, কিন্তু অপ্রকাশ্যে তাদের রাজনীতি তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।’

মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষকের ধর্ম অবমাননার অভিযোগ প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।

প্রসঙ্গত, গত ২২ মার্চ সকালে মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহম্মেদ পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ

এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পরে বিদ্যালয়ের ইলেকট্রিশিয়ান আসাদ বাদী হয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে মামলা করেন। রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমি মাঝে মাঝে ভাবি এ দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষকরা শিক্ষাদান করবে কীভাবে? কীভাবে সংখ্যালঘুদের হয়রানি করা হচ্ছে, হৃদয় মণ্ডলের ঘটনা তারই একটি প্রমাণ। সংখ্যালঘুদের ওপর যারা হামলা করছে, তাদের কোনও বিচার নেই। অহেতুক একের পর এক মামলা করা হচ্ছে, ইভটিজিং করা হচ্ছে। হৃদয় মণ্ডলের অপরাধটা কী? তিনি যদি বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি তো বিজ্ঞানের কথাই বলবেন। এর সঙ্গে ধর্ম টেনে নিয়ে যা হলো, তাহলে কী বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া যাবে না? শিক্ষার্থীরা শিখবে কী? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখিনি। রবীন্দ্রসংগীত বর্জনের কথাই হোক কিংবা টিপ পরা প্রসঙ্গই হোক না কেন, আমরা পাকিস্তান আমলে হাজারো মানুষের আন্দোলন দেখেছি। আজকে আন্দোলন কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘এখান থেকে বাংলাদেশের কীভাবে উত্তরণ ঘটবে আমি জানি না। তবে আমি এটুকু মনে করি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার কাছে আত্মসমর্পণ করে এসব থেকে বাংলাদেশকে উত্তরণ করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের কথা বলা যাবে, কিন্তু সেটা অনেক সুদূরপরাহত।’ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘হৃদয় মণ্ডলের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে যেভাবে আসামি বানানো হচ্ছে, তাতে এ ঘটনা নতুন কিছু না। এ রকম ঘটনা আগেও অনেক ঘটেছে এবং প্রশাসনের মধ্যে থেকে করা হয়েছে। এগুলো তো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য না। আমরা সে জন্যই বলছি হৃদয় মণ্ডলকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এগুলো তদন্ত করে যারা এর পেছনে দায়ী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বৈষম্য বিলোপ আইনের কথা আজকেই সংসদের আলোচনা হয়েছে, আর আজকেই এমন একটা ঘটনার খবর বের হলো। এগুলো কী সরকারের নজরে আসে না, দেশের ভাবমূর্তি কী খুব উজ্জ্বল করছে তা।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘দেশের ভেতর সরকার একটি সাম্প্রদায়িক নীতি অনুসরণ করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় তার প্রতিফলন ঘটানোর ফলে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলছে। তারই সর্বশেষ নিদর্শন হচ্ছে হৃদয় মণ্ডলের এ ঘটনা। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সরকার অবিলম্বে তার মুক্তির ব্যবস্থা করুক। এ ধরনের তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে হবে।’ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, লেখক ও গবেষক মফিদুল হক বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি ঘটনা এবং একটি আঘাত বলে আমি মনে করি। এটি শুধু হৃদয় মণ্ডলের ঘটনাই না, বাংলাদেশের সম্প্রীতি, সমাজকে যারা নষ্ট করতে চায়, ধর্মকে একটি ঘৃণার জায়গায় নিয়ে যেতে চায়, শান্তির একটি ধর্মকে হিংসাত্মক ধর্মে রূপান্তরিত করতে চাই; তারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাদের তো কোনও সীমা নেই। এখানে অল্প বয়সের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। সরকারের এটি দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা উচিত। তার মুক্তির পাশাপাশি যারা এর পেছনে আছে, ছাত্রদের উসকানি দিয়ে যারা এমন কাজ করাচ্ছে, এরা একটি সংগঠিত চক্র। ফেসবুক হয়ে গেছে বর্তমানে উসকানির একটি প্ল্যাটফর্ম। সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণার প্রকাশ তো আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দনীয় অপরাধ। এ ধরনের ব্যবস্থা আমাদেরও নিতে হবে।’


Leave a Reply

Your email address will not be published.