মুনমুন শারমিন শামস্, দেশের আত্মা মরে গেছে, পঁচে গেছে, সামনে বীভৎস অন্ধকার

মুনমুন শারমিন শামস্, দেশের আত্মা মরে গেছে, পঁচে গেছে, সামনে বীভৎস অন্ধকার

সংবাদ: ক্লাসে শিক্ষক বিজ্ঞান পড়াতে আসছেন। ক্লাস টেন। ছেলেগুলোর বয়স কত তাহলে? ১৫-১৬? এই বয়সী একদল ছেলে তাদের শিক্ষককে উস্কাচ্ছে। না, জ্ঞান আহরণের

উদ্দেশ্য না। তারা জানতে চায় না। তারা শিক্ষকটির ধর্মীয় পরিচয় জানে। জেনে বুঝে ইন্টেনশনালি তারা শিক্ষককে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন করছে, যাতে তিনি জবাব দেন। যাতে

তার জবাবের ভেতর দিয়ে এমন কিছু বেরিয়ে আসে, যাকে তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নাম দিয়ে একটি কুৎসিত অভিযোগ দায়ের করতে পারে। চিন্তা করেন, এই বয়সী

একদল ছেলে, তারা কতোটা ষড়যন্ত্র শিখেছে, কতোটা ছল শিখেছে, কতোটা বীভৎসতা ধারণ করে আছে এই বয়সেই। ১৩ মিনিট তারা নিজের শিক্ষকের কথোপকথন রেকর্ড করেছে।

অথচ ওই কথোপথনের ভেতরে একটিও মিথ্যে কথা নেই। ভুল নেই। শিক্ষক, বিজ্ঞানের শিক্ষক, নিজের জ্ঞান ও বোঝাপড়া তার ছাত্রদের সাথে শেয়ার করেছেন। হয়তো এতটাও করতেন না,

যদি না ছেলেগুলো তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতো। মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডল। কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত পাঠ্যবই দিয়ে কোচিং

করানো শিক্ষক নন। তিনি প্রচুর পড়ালেখা করেন, ভাবনা চিন্তা করেন, খোঁজখবর রাখেন। এমনই কপাল খারাপ ভদ্রলোকের, তার কপালে পড়েছে এই অসভ্য গোঁড়া, বিকৃত, ষড়যন্ত্রকারী ছাত্রের দল। তারা প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ পড়ে। সেই বই পড়ে তারা ধর্ম শেখে, বিজ্ঞান শেখে আর একজন সুশিক্ষিত আধুনিক শিক্ষককে চ্যালেঞ্জ করে।

এমন নয় যে, হৃদয় মন্ডল তাদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন নি বা তিনি তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন। বরং তিনি ধৈর্য ধরে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন এবং অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত উত্তর সব। কিন্তু এর কোনোটাই ওই গোবরমাথাওয়ালা ধর্মান্ধ ছাগলদের মস্তিস্কে ঢোকেনি। তারা সেগুলো রেকর্ড করে অভিযোগ দায়ের করেছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। লতা সমাদ্দারকে টিপ পরা নিয়ে নাজেহাল করার ঘটনায় আমার ক্ষোভ বিরক্তি সব হইসিল।

কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের বিষয়টা জেনে অক্ষম ক্রোধে আমার চোখে পানি আসতেসে। আমি জানি না ঠিকমতো বুঝাতে পারলাম কি না, আমার তীব্র আতঙ্কও হচ্ছে। যদিও এই আতঙ্ক নতুন কিছু না। গত কয়েক বছর ধরে এই আতঙ্ক আমাকে গিলে খাচ্ছে। কি এক অন্ধকার তলানিতে তলিয়ে গেছি আমরা। আর উদ্ধার নাই, বিশ্বাস করেন। আর বাঁচতে পারবেন না। মৌলবাদী ধরে ধরে জেলে পুরে ফাঁসি দিয়ে কোনো লাভ নাই, কারণ এরা আপনার একটা প্রজন্মের বুদ্ধি বিবেচনা জ্ঞান যুক্তিবোধকে কব্জা করার কাজটা সমাধা করে ফেলেছে।

উন্নয়নের চিন্তায় আপনি আর এই দিকে নজর দিতে পারেন নাই। এদিকে সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে। হৃদয় মন্ডলের বিরুদ্ধে এক পাল ধর্মান্ধ ছেলেকে লেলিয়ে দেয়াটার পেছনে অবশ্যই কারও না কারও হাত আছে। ছেলেগুলো নিজেরা নিজ বুদ্ধিতেই শুধু কাজটা করার সাহস পেল কি না, তা দেখতে হবে। এর পেছনে অবশ্যই অন্য কোনো শিক্ষক বা কোনো কর্তৃপক্ষের হাত থাকার সম্ভাবনা রয়ে যায়। সেটা খতিয়ে দেখা খুব খুব জরুরি। দেশ বাঁচবে কি না জানি না। দেশের আত্মা মরে গেছে। পঁচে গেছে। সামনে বীভৎস অন্ধকার।


Leave a Reply

Your email address will not be published.