মানুষ মারতে কয়টা গুলি লাগে? আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দিন

মানুষ মারতে কয়টা গুলি লাগে? আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দিন

আমার পাপাকে ফিরিয়ে দিন। পাপাকে ছাড়া ভালো লাগে না। রোজায় পাপার সঙ্গে আমার ইফতার করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু করতে পারছি না।

পাপাকে ফিরিয়ে দিন। আমি আমার পাপাকে চাই। পাপার সঙ্গে ঈদ করতে চাই। কথাগুলো বলছিল বংশাল থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

নিখোঁজ সোহেলের শিশুকন্যা সাফা। গতকাল রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে লেডিস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের আয়োজিত ‘গুম-খুনের শিকার

আমাদের যেসব সূর্যসন্তান- তাদের স্বজনদের নিয়ে’ শীর্ষক আলোচনা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সে এসব কথা বলেন। চট্টগ্রামে খুন হওয়া ছাত্রদলের

কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুর মেয়ে উম্মে হাবিবা মিম বলে, আজকে রোজা। আমি আমার বাবার সঙ্গে ইফতার করতে পারি না। আমারও

তো ইচ্ছা করে বাবার সঙ্গে রোজা পালন করার। ঈদের সময় ঘুরতে পারি না। আপনাদের উদ্দেশ্যে একটি কথাই বলবো আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। বাবার সঙ্গে ঈদ করবো।

জানি এই দেশে আমার বাবার হত্যার বিচার হবে না। একমাত্র স্রষ্টাই পারবে বিচার করতে। খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনির স্ত্রী মুনিয়া আক্তার বলেন, একজন মানুষকে মারতে কয়টা গুলি করতে হয়। কয়টা গুলি লাগে। তার বুকে ১৬টি গুলি করা হয়েছে। একটি তার ঘাড়ে এবং ডান হাতের তালুতে মোট ১৮টি গুলি করতে হয়েছে। আপনারাই বলেন, একটি মানুষ মারতে কয়টি গুলি করা প্রয়োজন? আমি তখন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। আমার বাচ্চাটি তার বাবাকে দেখেনি। তার বয়স এখন ৭ বছর চলছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। আমার সন্তানের বাবার নামের স্থানে লিখতে হয় লেট (মৃত) নুরুজ্জামান জনি। আমার বাচ্চা এসে প্রশ্ন করছে মা আমার বাবার নামের আগে লেট কেন? এই দেশে বাবা হত্যার বিচার হচ্ছে। ভাই হত্যার বিচার হচ্ছে। আমরা কি বিচার পাবো না? আমরা কবে বিচার পাবো। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব ধরনের গুম এবং হত্যার বিচার করতে হবে। এবং নিশ্চই হবে। আমরা সেই আশায় আছি। সেই বিচার যেন দেখে যেতে পারি এটাই প্রত্যাশা এবং প্রার্থনা আমাদের।

গুম হওয়া ঢাকা মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনের বড় বোন এবং মায়ের ডাক সংগঠনের আহ্বায়ক আফরোজা ইসলাম আঁখি বলেন, অনেক বছর পরে আমাদের গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। গুম হওয়া পরিবারগুলো এখনো মনে আগুন নিয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বজনকে ফিরে পাবেন সেই আশায় মায়েরা এবং স্ত্রীরা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এবং তারা হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ফেরত চায়। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাদের বিচার চান। বিএনপি’র সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছে প্রায় ১০ বছর। এই দশ বছরে বহুবার বহুস্থানে বিভিন্ন মাধ্যমে এ বিষয়ে কথা বলেছি। এটা নিয়ে কথা বলাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। একটি বিষয় বিশ্বাস করি আমাদের গুম হওয়া স্বজনরা ফিরে আসবেন। সেই প্রত্যাশায় আছি। যারা এই গুমের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার দেখার প্রত্যাশায় আমরা আছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের কোনো দাবি নেই। যারা নিজেরাই গুমের সঙ্গে জড়িত তারা কখনোই এর বিচার করবে না। তারা গুম কী জিনিস এটা স্বীকারই করেন না। তাই আমরা প্রত্যাশা করি ভবিষ্যতে এই গুম এবং খুনের বিচার পাবো। এখন না হলেও আগামী প্রজন্ম যাতে এই গুম খুনের বিচার করে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গুম হওয়া পরিবারের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার একদিন তারা পাবেন। রমজান ধৈর্য ধারণের মাস। এই দুঃশাসন সরকারের অবসান হবে। খুব বেশিদিন লাগবে না। যত অত্যাচার করেছেন এটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে ধরা পরেছে। এটা আরো বেশি প্রকাশিত হবে। বড় বড় প্রকল্প দেখাই, ব্রিজ দেখাই, পদ্মা ব্রিজ দেখাই। এখন দেখা যাচ্ছে বিদেশি লোনের সুদ পরিশোধের টাকার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই সরকার যাবেন যখন নিজের স্থান থেকে এক কদম সরবার সুযোগ থাকবে না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বছরের পর বছর ধরে এই শিশুরা তাদের গুম হওয়া বাবা এবং স্বজনকে খুঁজছে। এ রকম প্রায় ৬শ’ পরিবার আছে যারা তাদের স্বজনকে খুঁজছে। কিন্তু তাদেরকে তারা পাচ্ছে না। এবং এটা প্রমাণিত যে, তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। এবং তারপর থেকে তারা গুম হয়েছে। যে কারণে র‌্যাবসহ অনেক কর্মকর্তার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আমরা যদি এই সরকারকে সরাতে না পারি তাহলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না। আজকে সমস্ত নির্যাতন নিপীড়ন, গুম, খুন সবকিছু বন্ধ করতে হলে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যেটা তা হলো ভয়াবহ দানবকে সরিয়ে গণতন্ত্র এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং সেটা এই দেশের মানুষকে আন্দোলন এবং গণঅভ্যূথানের মধ্যে দিয়ে করতে হবে। জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মো. মসিউর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.