সবাইকে তাচ্ছিল্য করা এক ফেসবুক লাইভ


আওয়ামী লীগ চমক পছন্দ করে। নানা ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভা বহুমুখী। আর এসব প্রতিভা তারা লুকিয়েও রাখে না। এ দেশে দুর্নীতি নতুন নয়, কিন্তু সেই দুর্নীতি যে হাজার কোটি টাকা হতে পারে সেই পথ প্রথম দেখালো

আওয়ামী লীগ। দল ক্ষমতায় থাকলে কর্মীরা উজায়, সেটিও নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই উজানোতে প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার সংস্কৃতি চালু করলো আওয়ামী লীগ। আজকাল ছাত্রলীগের কর্মীর চাঁদাবাজিতে ভিসির সম্পৃক্ততার কথা আর অবাক করে না আমাদের।

আমাদের এই অবাক হবার ক্ষমতা গত ১০ বছরে কমে এসেছে অনেকটা। আমাদের এই বিস্ময়বোধ অনেকখানি কমিয়ে আনাটাও আওয়ামী লীগের একটা বড় কৃতিত্ব। তারপরও ৯ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটা ভিডিও দেখে হতবাক হয়েছে অনেকেই। ভিডিওটি এক ছাত্রলীগ কর্মীর। তিনি পরীক্ষা চলাকালীন ফেসবুক লাইভে এসে বক্তব্য দিয়েছেন।

পরীক্ষায় এতদিন নকলের মহোৎসব দেখেছি, এবার দেখলাম লাইভ উৎসব। লাইভে এসে তিনি যা বলেছেন সেটাও লক্ষণীয়। পুরো হলজুড়ে একটা ঢিলেঢালা উৎসব উৎসব পরিবেশ। বহু বছর পরীক্ষা দেওয়া হয় না। আওয়ামী লীগের সময়কালে এটিই হয়তো পরীক্ষার হলগুলোর স্বাভাবিক চিত্র, আমার ঠিক জানা নেই। লাইভে তিনি একা আসেননি।

কথায় কথায় যেমন যুক্ত করেছেন সহপাঠীদের তেমনি শিক্ষক ম্যাডামের কথাও বলতে ভোলেননি। চলুন একটু দেখে আসা যাক চমকপ্রদ এই লাইভে তিনি ঠিক কী কী বলেছেন। তার এই লাইভ আমাদের জন্য অনেকটা জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন। আমাদের পরীক্ষা চলছে, সবাই লিখছে, আমি বসে আছি। সবাই লিখছে বাংলায়, আমি তো বাংলাই লিখি না, ইংলিশে লিখি।

অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল পরীক্ষার হল ফেসবুকে লাইভ দেবো। সেই ইচ্ছা আজ পূরণ হলো। ম্যাডামও দেখি আমাকে ভিডিও করছে। স্যারেরা ঘুমাচ্ছে, আমি ইংরেজিতে লিখেছি, সালামও লিখেছে।’ আমাদের ‘সোনার ছেলে’র দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল পরীক্ষার হলে লাইভ করার। মানুষের ভালো ফল করার স্বপ্ন থাকে, পাস করে ভালো চাকরির স্বপ্ন থাকে, স্বপ্ন থাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার।

মনির হোসেন সুমনের স্বপ্ন ছিল পরীক্ষার হলে লাইভ করার। মানুষের স্বপ্ন থাকে কিন্তু পূরণ হয় না অনেক সময়ই। তিনি ভাগ্যবান, তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তার লাইভ যথেষ্ট শিক্ষণীয় ছিল আমাদের জন্য। তিনি লাইভ না করলে জানতে পারতাম না আজকাল পরীক্ষার হলে ইনভেজিলেটররা ঘুমায়, ম্যাডামরা ভিডিও করে। আমি জানি না সেদিনের সেই ঘু’মন্ত শিক্ষক বা ভিডিও ধারণকারী ম্যাডামের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা। কিংবা কে জানে এখন হয়তো পরীক্ষার হলে ঘুমানোই কাজ ইনভিজিলেটরদের।

ভিডিওর একপর্যায়ে পাসের শিক্ষার্থীর কাছে মনির হোসেন জানতে চান, ‘দেখি, তুই কী লিখেছিস?’ তখন ভিডিওতে দেখা যায়, সে লিখেছে, ‘না লিখে আমরা এ+ পেতে চাই।’ খাতায় না লিখে এ+ পেতে চাওয়া খুব অবাক করেনি আমাকে। ছাত্রলীগ পরিচয় থাকবে, আবার নম্বর পেতে বা পাস করতে খাতায়ও লিখতে হবে, সেটি তো হবার নয়। লিখেই যদি এ+ পেতে হয় তাহলে আর ছাত্রলীগ করা কেন? তারা কষ্ট করে এখনও অন্তত পরীক্ষার হলে যাচ্ছেন সেটাই তো অনেক কিছু।

‘আমাদের ভিডিও ভাইস চেয়ারম্যান দেখছেন, ভাইস চেয়ারম্যান মন্তব্যে লিখেছেন, গল্প না করে তোরা খাতায় লেখ। এমপি সাহেবও দেখছেন নাকি, তিনি আর ভাইস চেয়ারম্যান এক মোটরসাইকেলে আছেন।’ কী চমৎকার তাই না? ভাইস চেয়ারম্যান দেখছেন, হয়তো দেখছেন এমপি সাহেবও, একই মোটরসাইকেলে আছেন যখন। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে ভাইস চেয়ারম্যানের উচিত ছিল তাৎক্ষণিক ফোন করে লাইভ করতে বারণ করা, শাসন করা। কিন্তু না, তিনি তাকে খাতায় লিখার নসিহত করেছেন। কিছু বলেননি স্বয়ং এমপিও। কাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে মুনিররা থাকে, কাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তারা পরীক্ষার হল থেকে ফেসবুক লাইভ করার সাহস পায়, কাদের ভরসায় খাতায় একটা শব্দ না লিখেও এ+ পাওয়ার খোয়াব দেখে, কারা মুনিরদের তৈরি করে সেটি বোঝা কি খুব অসম্ভব?

‘কী সুন্দর পরীক্ষার হল, পরীক্ষা দিচ্ছি। অ্যাই, তোরা তো জীবনে পরীক্ষা দিতে পারবিনে, এই দেখ সালামও আছে। পরীক্ষার হলে লাইভে আছি, আমার প্রাণের সংগঠন কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এ প্লাস তো পাবোই, ম্যাডামরা সবই বলে দিচ্ছে। পরীক্ষার খাতায় গ্রুপের জায়গা লিখে দিয়েছি, “এমপি আনার গ্রুপ”। জয়ও তাই লিখেছে।’ একপর্যায়ে লাইভে পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনরত এক শিক্ষিকাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি কিছু বলেন আমার লাইভে?’

ভাগ্যিস লাইভ করেছিল মুনির। তাই না আমরা প্রমাণ পাচ্ছি, পরীক্ষার হলে ম্যাডামরা সব বলে দেন। জানতে পারছি পরীক্ষার খাতায় গ্রুপের জায়গায় লেখা যায় “এমপি আনার গ্রুপ”। এমন নয় যে হলে কোনও পর্যবেক্ষক ছিল না। পরীক্ষার হল যেমন থাকে এটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে পর্যবেক্ষকদের ঘাড়ে মাথা একটিই, জানেন ছাত্রলীগের এই সোনার ছেলেদের পেছনে কারা আছে। পরীক্ষার হলে এমন আচরণ দেখেও টুঁ-শব্দটি করেননি। শুধু সেটাই নয়, লাইভে কথা বলে নিজের এমন ভয়ংকর কাজের অংশ হতে শিক্ষিকাকে আহ্বান করছেন সুমন!

‘আমরা ছাত্রলীগ, যেখানে যাবো সেখানেই বুলেট। রোজা থেকে পরীক্ষা দিচ্ছি, গোল্ডেন এ প্লাস পাবো। পরীক্ষার খাতায় গ্রুপের জায়গা লিখে দিয়েছি, “এমপি আনার গ্রুপ”(সরকারি দলীয় স্থানীয় এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার)। স্যারেরা এ প্লাস না দিলে বোর্ডমোড ভেঙে ফেলবানে।’ ছাত্রলীগ বুলেট, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই কারও সন্দেহ নেই। চাঁদাবাজি থেকে ধ’র্ষণ, খু’ন থেকে রাহাজানি হেন কোন অপরাধ নেই যার সঙ্গে ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের নাম আসে না। তাই এই লাইভ দেখার পর আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, এতটা বীভৎস কেন লাগলো আমার? মনে হলো প্রকাশ্যে হলে বসে এই লাইভ আসলে পুরো সিস্টেমকে তাচ্ছিল্য করা।

এমনিতেই সব করা আর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করার মধ্যে পার্থক্য বিরাট। লুকিয়ে করার মধ্যে মানুষকে ন্যূনতম কেয়ার করার ব্যাপার থাকে, যা থাকে না প্রকাশ্যে, সদর্পে পাবলিকলি করার মধ্যে। এই লাইভটিতে সুমন যেমন বললো, ‘আমরা ছাত্রলীগ, যা ইচ্ছা তা-ই করার ক্ষমতা রাখি, কোনও আইন-কানুন বা নিয়ম আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না।’ নিজের পরিচয় লিখতে গিয়ে এরা অনায়াসে লিখতে পারে আনার গ্রুপ, একটা শব্দ না লেখার পরও এ প্লাস না দিলে ভাঙতে পারে যেকোনও কিছু। এই তাচ্ছিল্য যে সিস্টেমকে করা হলো তার অংশ আপনি যেমন, তেমনি আমিও।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।


Leave a Reply

Your email address will not be published.