আমার কলিজা খালি হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়

আমার কলিজা খালি হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়

চার বছর পর বিদেশ থেকে আসছি। এসে প্রথমবারের মতো মেয়ের মুখটা দেখলাম। আমাকে যে সে প্রথমবারের মতো সরাসরি দেখল, তা কোনোভাবেই বোঝা যায়নি। সারাক্ষণই সঙ্গে থাকতে চায়।

যেখানেই যাই আমার পিছু ধরে। কিন্তু প্রথম দেখাই যে শেষ দেখা হবে তা বুঝিনি। আমার কলিজা খালি করে দিল সন্ত্রাসীরা। মেয়েটার সঙ্গে ঈদটাও করতে দিল না। ’ গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর জাতীয় চক্ষু

বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একটি কেবিনে কথাগুলো বলার সময় বারবার ঢুকরে কেঁদে উঠছিলেন নোয়াখালীতে গুলিতে নিহত চার বছরের শিশু তাসপিয়া আক্তারের বাবা আবু জাহের। পাশে বসা তাসপিয়ার মা জেসমিন আক্তারের কান্নাও থামানো যাচ্ছিল না।

জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমার ছোট্ট একটা মেয়ে। তার কী দোষ? যারা আমার মেয়েকে মারছে, আমি তাদের সবার ফাঁসি চাই। ’হাসপাতালের বিছানায় বসে আবু জাহের বলেন, ‘কয়েকটা স’ন্ত্রাসীর কারণে হাজীপুরের দেড়-দুই শ পরিবার জিম্মি হয়ে আছে।

তাদের কিছু বললেই তারা অত্যাচার করে। এমনকি ইভ টিজিংসহ নানা অপকর্ম করছে। তাদের নামে আট-দশটি মামলাও আছে। বেগমগঞ্জ থানা প্রশাসন এখনো তাদের কিছু করতে পারেনি। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে চাইলেও তিন দিন পার হয়ে গেছে। একটা সন্ত্রাসীকেও ধরতে পারেনি। আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমি তাঁর কাছে মেয়ে হ’ত্যার বিচার চাই। ’

আবু জাহের বলেন, ‘আমি প্রবাসে থাকি। আট বছর পর আল্লাহপাক আমাকে একটি কন্যাসন্তান দিয়েছেন। ওই জালিমরা আমার মেয়েকে এমনভাবে গুলি করছে, আমাকে মেয়ের সঙ্গে ঈদটাও করতে দিল না। আমার কলিজা খালি হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই সন্ত্রাসীরা চিহ্নিত।

এদের নামে আট-দশটা মামলা আছে। ইমন, মঈন, রহিমসহ আরো কয়েকজন আছে। আমি দেশের বাইরে থাকায় সবার নাম জানি না। আমাদের চার ভাই দেশের বাইরে থাকেন। বাড়িতে পুরুষ লোক নেই। হাসপাতালে বসেই শুনতে পাচ্ছি, লোকজন বলছে, আমাদের বাড়িতে হামলা করবে। আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তারও দাবি জানাচ্ছি। ’

আবু জাহের পূর্ববিরোধের কারণ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের পাশের বাড়ির ফিরোজ ও সুফি আলমদের মাটি কিনেছিল বাদশা। সে বেশি মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছিল। এ নিয়ে বাদশার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব হয়। আমি প্রতিবেশী হিসেবে বাদশার মাটি কাটায় বাধা দিয়েছিলাম। এ নিয়ে মিটিংও হয়েছে।

সেটা এক সপ্তাহ আগের ঘটনা। ওই বাদশারই ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা আমার মেয়েকে গু’লি করে মেরেছে। আমি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে দোকানে বসে ছিলাম। প্রথমে রিমন ওপরের দিকে গু’লি ছুড়ল। এরপর বলল তুই তো মিটিংয়ে ছিলি। এই বলে আমার মেয়েকে প্রথমে একটা পাথর মারল। এরপর আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে দৌড় দিলে তারা গুলি করল। ’

বুধবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে ‘মালেকার বাপের দোকান’ নামক স্থানে বিকেল সাড়ে ৩টায় চার বছরের শিশু তাসপিয়া আক্তারকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন সৌদিপ্রবাসী মাওলানা আবু জাহের। এ সময় পূর্ববিরোধের জের ধরে প্রথমে সন্ত্রাসীরা কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। আবু জাহের তাঁর মেয়েকে কোলে নিয়ে পালানোর সময় পেছন থেকে গুলি করে স্থানীয় সন্ত্রাসী রিমন। এতে শিশু তাসপিয়ার মাথায় গুলি লাগে। আর তার বাবাও গু’লিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে ওই দিন রাত সাড়ে ৮টায় কুমিল্লায় তাসপিয়ার মৃ’ত্যু হয়।

পরে তাসপিয়ার লাশ নিয়েই বাবা আবু জাহের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরপর গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই বাড়ি ফিরে যান। পরদিন বৃহস্পতিবার আবু জাহের মেয়ের জানাজা পড়ান। গুলিতে আবু জাহেরের ডান চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুক্রবার থেকে তিনি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি ডান চোখে দূরের কিছুই দেখছেন না। কাছের কিছুও একেবারে ঝাপসা দেখছেন। আবু জাহের গত আট বছর ধরে সৌদিপ্রবাসী। তিনি সেখানকার একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করেন। চার বছর পর তিনি গত ৩০ জানুয়ারি দেশে আসেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ পালন শেষে তাঁর সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।


Leave a Reply

Your email address will not be published.