সাধারণ সম্পাদক নিয়ে নানা জল্পনা


আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। টানা দশম বারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হতে যাচ্ছেন ৪১ বছর ধরে দলটির নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কারণ তিনি দলটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। তবে দলমত-নির্বিশেষে সবার কৌতূহল— কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক? ওবায়দুল কাদেরের হ্যাটট্রিক, নাকি চমক দেওয়ার মতো অন্য কেউ?

আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। চলছে নানামুখী হিসাবনিকাশ, বিচার-বিশ্নেষণ, জল্পনা-কল্পনা। টানা দুই বার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন ওবায়দুল কাদের।

তিনি ছাড়াও আগামী সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার ক্ষেত্রে যাদের নাম আলোচনায় আছে তারা হলেন— দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম,

জাহাঙ্গীর কবির নানক, ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব কাউন্সিলরদের। কিন্তু কাউন্সিলররা বরাবরই এ দায়িত্ব ন্যস্ত করেন সভাপতির ওপর। তাই পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন,

তা নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ সভাপতির সিদ্ধান্তের ওপর। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন— এ ব্যাপারে এখনো কাউকে কোনো ইঙ্গিত দেননি দলীয় সভানেত্রী।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর কিংবা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে দল গোছাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলে যেখানেই দ্বন্দ্ব-বিভেদ, গ্রুপিং-কোন্দল, সেখানেই কেন্দ্রের কঠোর হস্তক্ষেপ। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এভাবেই সাংগঠনিক বিরোধ মিটিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কাজে হাত দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

আগামী ডিসেম্বর দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই তৃণমূল থেকে দলকে পুনর্গঠন ও ঢেলে সাজানোর কাজে সাংগঠনিক বিরোধকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা দ্রুত নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

দলকে ঢেলে সাজানোর রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে চলতি মাসে গণভবনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আর এই বৈঠকে তৃণমূলের সম্মেলনের পাশাপাশি ডিসেম্বরে দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলের প্রস্তুতি হিসেবে দলের বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

জানা গেছে, দলের সাংগঠনিক বিভাগ ও জেলাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের আগামী জুন-জুলাই মাসের মধ্যে সারা দেশের মেয়াদোত্তীর্ণ শাখা ও ইউনিটগুলোর সম্মেলন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। উপজেলা, থানা ও পৌরসভা কমিটি রয়েছে ৬৫০টি। এসব শাখার সম্মেলন চলছে। এছাড়া সহযোগী সংগঠনগুলোকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সুসংগঠিত করার কাজও চলছে সমানতালে।

চলতি বছর দলের দুই ধাপে সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন করার পরিকল্পনা রয়েছে। জুন-জুলাই এবং অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর— এই দুই ধাপে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একই মঞ্চে ১০ থেকে ১৫ দিনের গ্যাপ রেখে সম্মেলন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১৯ সালের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২১টি জাতীয় সম্মেলন হয়েছে আওয়ামী লীগের। অতীতের সম্মেলনগুলোতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন শত শত নেতা। তবে এখন পর্যন্ত সভাপতি হয়েছেন ছয় জন। এর মধ্যে বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ ৯ বার। ১৯৮১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

দলের প্রথম সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত চারটি কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর মঈ বছর একটি বিশেষ কাউন্সিলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। ১৯৬৪ সালে দলের পঞ্চম কাউন্সিলে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি পদে ছিলেন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। মঈ বছর ষষ্ঠ কাউন্সিলে দলের সভাপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সভাপতি পদে ছিলেন। ১৯৭৪ সালে দশম কাউন্সিলে সভাপতি হন এ এইচ এম কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঘাতকের গুলিতে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হন তিনি। এরপর ১৯৭৮ সালে কাউন্সিলে সভাপতি হন আবদুল মালেক। তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ও জাতীয় চার নেতা নিহত হওয়ার পর ১৯৭৬ সালে মহিউদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন। এর পরের বছর ১৯৭৭ সালে দলের ১১তম কাউন্সিলে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করা হয়।

আওয়ামী লীগ গঠনের পর ১৯৪৯ সালে দলের প্রথম কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। এরপর ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দলের দ্বিতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক হন আবদুর রাজ্জাক। ১৯৮৭ সালে সাধারণ সম্পাদক হন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। ছিলেন ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। এরপর জিল্লুর রহমান আবারও দুই মেয়াদে ২০০২ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

২০০২ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক হন আবদুল জলিল। ছিলেন ২০০৯ সাল পর্যন্ত। ঐ বছর দলের ১৮তম কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। ঐ বছরের কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়ে নবম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন ওবায়দুল কাদের। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ৯ জন। সবচেয়ে বেশি চার বার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিল্লুর রহমান। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ তিনবার; আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও ওবায়দুল কাদের দুই বার করে; প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও আবদুল জলিল এক বার করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

তবে ১৯৭২ সালের পর থেকে কেউই টানা তিন বার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হননি। সেই হিসাবে অনেকে মনে করছেন আগামী সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন মুখ আসছে। ‘সাধারণ সম্পাদকের’ দায়িত্ব পেতে কয়েক মাস আগে থেকেই তত্পরতা শুরু করেছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তারা যেমন নিজেদের সাংগঠনিক তত্পরতা বাড়িয়েছেন, তেমনি নেতাকর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ মজবুত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক পদে আবারও রাখা হতে পারে। তবে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়টি নিয়ে ভাবা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত নাম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও জাহাঙ্গীর কবির নানক। দল ও সরকারকে আলাদা করার যে কৌশল, তাতে তারা এগিয়ে আছেন। কেননা, মায়া ও নানক দুই জনই মন্ত্রী নন, সংসদ সদস্যও নন। গত নির্বাচনে তারা মনোনয়ন পাননি। মায়া মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দক্ষতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। নানক তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন, ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন, যুবলীগেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। দক্ষ সংগঠক হিসেবে দলে তাদের পরিচিতি আছে।

ড. আব্দুর রাজ্জাককেও সাধারণ সম্পাদক পদের সম্ভাব্য হিসেবে গণ্য করছেন অনেকে। তিনি দলের প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য এবং কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচিতি আছে। গত দুই সম্মেলনে দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র এবং গত নির্বাচনে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ করে তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। দলের অভ্যন্তরীণ, জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে মাহবুব-উল-আলম হানিফের নাম খুব জোরেশোরেই আলোচনায় আছে। দীর্ঘদিন তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখিয়েছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন। গত কয়েক বছরে তিনি অনেক ইস্যুতে তার সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। জাতীয়ভাবেও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তার।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে ড. হাছান মাহমুদের সম্ভাবনাও কম নয়। তিনি দলের অন্যতম মুখপাত্র। সাংগঠনিক বিষয়ে তিনি এখন ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। দক্ষতার সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। সমানতালে সময় দিচ্ছেন দলেও। এসব কারণে তার সম্ভাবনাকে অনেকেই এগিয়ে রাখতে চান। যুগ্ম সম্পাদক পদে অপেক্ষাকৃত তরুণ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কর্মীদের অত্যন্ত পছন্দের একটি নাম। কর্মীবান্ধব হিসেবে তার পরিচিতি আছে। ডা. দীপু মনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং শিক্ষামন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে তার নামও শোনা যাচ্ছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.