সুপ্রিম কোর্ট বারে নতুন মডেল

সুপ্রিম কোর্ট বারে নতুন মডেল

জটিলতার কারণে আটকে ছিল সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনের ফল ঘোষণা। সাধারণ সম্পাদক পদে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী প্যানেলের প্রার্থী আবদুন নুর

দুলালের চেয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবী সমর্থিত প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল বেশি ভোট পেয়েছেন এমন তথ্য আসার পর এ পদে আবার ভোট গণনার দাবি তোলা হয়।

দেড় মাস এ পদের ফল ঘোষণা হয়নি। বুধবার এই পদের ফল ঘোষণা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেলো সুপ্রিম কোর্টে। নির্বাচনের ব্যালট রাখা কক্ষ ভেঙে পুলিশ পাহারায় তা গণনা করে নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা।

এই ঘটনাকে নজিরবিহীন এবং লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। এটি আইন অঙ্গনে একটি খারাপ নজির হয়ে থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি নতুন মডেল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমরা সাবেকরা ফলাফল ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনার এ ওয়াই মশিউজ্জামানের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি ফের দায়িত্ব নিতেও রাজি হলেন

কিন্তু একটি পক্ষ মানলেন না। আমার দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে বারের ফলাফল নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেনি। সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বারের ফলাফল নিয়ে এমন ঘটনা আইনজীবীদের জন্য নজিরবিহীন,

লজ্জাজনক বলে মনে করেন তিনি। এখন দেশে তো আর কোনো ইলেকশন নেই। সুপ্রিম কোর্ট বারে নির্বাচন হতো, কারও অভিযোগ ছিল না। কিন্তু সেটাও এখন বিতর্কিত হলো। সিনিয়র এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। মানবজমিনকে বলেন, যেভাবে সুপ্রিম কোর্ট বারের ফলাফল ঘোষণা করা হলো তা আইন অঙ্গনে নজিরবিহীন হয়ে থাকবে। এটা সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের জন্য লজ্জাজনক। এক বছরের জন্য বারের কমিটি হয়। এরপরেও এমন একটি কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটলো। যা মোটেও কাম্য ছিল না।

সুপ্রিম কোর্ট বারের এই ফলাফল নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এমন ঘটনা তাদের দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে দেখেননি।

মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেন, সুপ্রিম কোর্টের একজন নিয়মিত আইনজীবী হিসেবে আমি ঘোষণা করছি যে, আমি কোনো প্রার্থীকে জোর করে পদ দখল করার জন্য সম্মতি দেইনি। কোনো দলের পরিচয়ে কোর্ট অঙ্গনে মারামারি করার সম্মতি দেইনি। সাধারণ আইনজীবীদের মতামতের মূল্য না দিলে বার টিকবে না। এর আগে আরেক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হওয়ার পর ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই পুনঃগণনার দাবি জানান একজন প্রার্থী। বিশৃঙ্খলার কারণে ভোট গণনা যেমন শেষ হয়নি তেমনি ফলাফল ঘোষণাও হয়নি। এদিকে নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ। এখন পুনরায় নির্বাচন দেয়া ছাড়া গতি নেই। এর বাইরে যাই হোক না কেন তা হবে বেআইনি। পুনরায় নির্বাচন হলে যারা ঝামেলা পাকিয়েছেন তারা দুই থেকে তিন হাজার ভোটে ফেল করবেন আশঙ্কা প্রকাশ করে পুনরায় ভোটের দিকে যাবেন না তারা। আইন নিশ্চিত করতে যারা কাজ করেন তারা নিজেরা কতোটা বেআইনি আচরণ করেন তা দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। পেশায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান যা অবশিষ্ট ছিল তা শেষ হয়ে গেল।

সিনিয়র আইনজীবী মহসিন রশিদ মানবজমিনকে বলেন, এটি কোনো সমস্যাই ছিল না। একটি সাধারণ সভা ডেকে নতুন একটি কমিটি করা যেত। এরপর তারা সব পদের ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করতে পারতেন। এমন পরামর্শ আমরা দিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী নেতারা তা করেননি। এটি করলে আজ সুপ্রিম কোর্ট বারের ফলাফল নিয়ে এমন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূত্রপাত হতো না।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আমি আমার জীবনে তো দেখিইনি, আমার দাদার জীবনেও দেখিনি। এতবড় কাণ্ড ঘটে গেল। বাংলাদেশের জুডিশিয়ারি ধ্বংস হয়ে গেল। কিন্তু এই অবস্থাতেও আমরা প্রধান বিচারপতির কোনো ভূমিকা দেখি নাই। প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সুয়োমটো রুল জারি করা উচিত ছিল। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায়। তিনি বলেন, তারা সুপ্রিম কোর্ট বারের একটা সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করেছে। আমাদের দাবি প্রধান বিচারপতির কাছে। আদালত খোলার পূর্বেই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে নির্বাচিত কমিটিকে পুনর্বহাল করার দাবি জানাচ্ছি। সবাই যাতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে সেরকম একটা রুলিং আমরা প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে চাই।

এদিকে, গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের ল’ রিপোর্টার্স ফোরামে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২২-২৩ সেশনের নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপিপন্থি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। একই সঙ্গে বারের সম্মেলন কক্ষের তালা ভেঙে ভোট পুনর্গণনা করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের আব্দুন নূর দুলালকে সম্পাদক পদে বিজয়ী ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা।
এ সময় বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে ভোট গণনার বিষয়ে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। আগামী ৫ই মে’র মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা। এ ছাড়া ভোট পুনর্গণনা ও ফলাফল ঘোষণার বিষয়ে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে অনুসন্ধানের দাবি তোলেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফলাফল ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে অনভিপ্রেত আচরণ করা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য লঙ্ঘন করে নজিরবিহীনভাবে সন্ত্রাসী এবং অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এর ফলে বারের ৭৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অবিলম্বে সাংবিধানিকভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করে এ অচলাবস্থা নিরসনের দাবি জানান এ জে মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, আব্দুন নূর দুলালের অবৈধ প্রক্রিয়ায় সেক্রেটারির রুম দখলকে প্রত্যাখ্যান করছি। দলমত নির্বিশেষ সব আইনজীবীকে এর রিরুদ্ধে স্বোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীন বলেন, আগামী ৫ই মে’র মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। তা না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে। সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব উদ্দিন খোকন একজন বিচারপতিকে দিয়ে এ ঘটনা তদন্ত দাবি করেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব এডভোকেট মো. ফজলুর রহমান, সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, সাবেক সম্পাদক বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সভাপতি এডভোকেট আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, সদস্য সচিব গাজী মো. কামরুল ইসলাম সজল, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী প্রমুখ।

বুধবার নিজেকে নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটির নতুন আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাত ১০টায় বারের ফল ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী ফোরামের নেতা ওয়াজি উল্লাহ। তিনি দাবি করেন, আবদুর নুর দুলাল ২ হাজার ৮৯১ ভোট পেয়েছেন, অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রুহুল কুদ্দুস কাজল ২ হাজার ৮৪৬ ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ, দুলাল তার প্রতিদ্বন্দ্বী কাজলের চেয়ে ৪৫ ভোট বেশি পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেল থেকে সভাপতি পদে এডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সহ-সভাপতি পদে মো. শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেন, সদস্য পদে ফাতেমা বেগম, সাহাদত হোসাইন রাজিব ও সুব্রত কুমার কুণ্ডুকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে সহ-সম্পাদক পদে মাহফুজ বিন ইউসুফ ও মাহবুবুর রহমান খান, ট্রেজারার মোহাম্মদ কামাল হোসেন, সদস্য ব্যারিস্টার মাহদীন চৌধুরী, গোলাম আক্তার জাকির, মো. মনজুরুল আলম সুজন ও কামরুল ইসলামকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ফল ঘোষণার পরই সমিতির সম্পাদকের কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। সম্পাদকের চেয়ারে বসেন দুলাল। এ সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে এই কক্ষে সম্পাদকের নামফলক পাল্টে রুহুল কুদ্দুস কাজলের বদলে আবদুন নূর দুলালের নাম সাঁটানো হয়।

গত ১৫ ও ১৬ই মার্চ এক বছরের জন্য (২০২২-২৩ মেয়াদ) সভাপতি ও সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদে আইনজীবী প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ হয়। ১৭ই মার্চ রাতে ভোটগণনা শেষে ফল ঘোষণার মুহূর্তে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা সম্পাদক পদে ভোট পুনঃগণনার দাবি জানান। এ নিয়ে হইচই-হট্টগোলের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক এ ওয়াই মসিউজ্জামানের পদত্যাগে ফল ঘোষণা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। প্রায় দেড় মাসেও এ জটিলতার নিরসন না হওয়ায় এতদিন আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হয়নি।

সুত্রঃ মানবজমিন


Leave a Reply

Your email address will not be published.