এক যৌ’নকর্মী মায়ের বুকফাটা কান্না, জানলে আপনিও কাঁদবেন


সংবাদ: বিশ্ব‘মা’ দিবস। পৃথিবীর সব মা চান তার সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, সুখী হোক। নি’ষিদ্ধ পল্লির একজন মাও এর ব্যতিক্রম নন। তেমনই একজন মা আলেয়া বেগম (ছদ্মনাম)।

আলাপকালে তিনি বলেন, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য আমি সব করেছি। মেয়ে আমার উচ্চশিক্ষিত হয়েছে; কিন্তু তাতে কি লাভ হয়েছে? আজ আমার কারণে আমার মেয়েকে সমাজের প্রতিটি পদে পদে নিগৃহীত ও

অপমাণিত হতে হয়। এমএ পাশ করেও আমার পরিচয়ের কারণে কোনো ভালো চাকরি পাচ্ছে না। সমাজের অন্য ১০টি মেয়ের মতো সমাজে চলতে পারছে না। মেয়েকে নিয়ে আমার স্বপ্ন যেন একটু একটু করে ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। অশ্রুসজল কণ্ঠে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন আলেয়া।

সরেজমিন আলাপকালে তিনি জানান, দেড় যুগ আগে ভালোবেসে তিনি বিয়ে করেন। বিয়ের পর জানতে পারেন ভালোবাসার মানুষ তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তিনি বিবাহিত এবং ২ সন্তানের বাবা। সেই সঙ্গে মাদকাসক্ত। তারপরও তিনি সেই স্বামীর ঘরে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেননি।

মাতাল স্বামীর পাশাপাশি তার সতিনও তাকে অত্যাচার করতেন। এরই মাঝে তার কোলে আসে ফুটফুটে কন্যাশিশু স্বপ্না (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, এ অবস্থায় তার স্বামী তাদের ফেলে পালিয়ে যায়। তিনিও স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। তার স্বামী ঢাকায় আছে শুনে কোনো কিছু না বুঝেই রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশে;

কিন্তু এভাবে ঢাকায় গিয়ে কোনো মানুষকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না, তা তিনি তখনো ধারণা করেননি। গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় তার এক দুঃসম্পর্কের বোন থাকার কথা তিনি জানতেন। ঢাকা থেকে নিরাশ হয়ে তিনি দৌলতদিয়ায় আসেন ওই বোনের সঙ্গে দেখা করতে। এতেই তার স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যায় যৌনপল্লি। বিষয়টি যখন তিনি বুঝলেন,

তখন তিনি সেখান থেকে মুক্ত হতে গিয়ে জানলেন, এখান থেকে যেতে হলে তাকে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু ৫ হাজার টাকা তো দূরের কথা তখন তার কাছে ৫টি টাকাও ছিল না। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তার জীবন তো শেষই হয়ে গেছে। এখানে থেকেই তিনি মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করবেন।

শিশু স্বপ্নাকে তিনি প্রথমে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পায়াক্ট বাংলাদেশের সেফহোমে এবং একটু বড় হলে ভর্তি করেন অপর এনজিও কেকেএস সেফহোমে। সেফহোমে থেকে স্বপ্না তার মায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটু একটু করে এগিয়ে যান। সম্প্রতি তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে সাফল্যের সঙ্গে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। কিন্তু পড়াশুনা শেষ করে এখনো ভালো কোনো চাকরি জোটেনি তার ভাগ্যে।

আলেয়া অশ্রুসজল চোখে বলেন, আমি পরিস্থিতির শিকার হয়ে অন্ধকার পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছি। এতে আমার মেয়ের কি কোনো অপরাধ ছিল? কী পাপ করেছে আমার মেয়ে? কেন সে সমাজের অন্য ১০ জন মেয়ের মতো জীবনযাপন করতে পারবে না। এ সময় পরিচয় হয় স্বপ্নার সঙ্গে। লম্বা, দুধে-আলতা গায়ের রং, দেখে বোঝার উপায় নেই তার জীবনে জড়িয়ে রয়েছে এক নির্মম ইতিহাস। বুকভরা রয়েছে রাজ্যের কষ্ট ও হতাশা।

আলাপকালে তিনি জানান, ছাত্রী অবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তে ভয়ে থাকতে হয়েছে তার পরিচয় যদি কেউ জেনে ফেলে! কিন্তু সত্য কত সময় আড়াল করে রাখা যায়। এজন্য প্রতি পদে পদে তাকে নিগৃহীত হতে হয়েছে। তারপরও তিনি লেখাপড়া শেষ করেছেন। লেখাপড়া শেষ করেও যখন কোনো চাকরি পাচ্ছেন না, তখন আবার হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলাম। এ সময় তিনি যেখানে থেকে বড় হয়েছেন, সেই সেফহোমে অস্থায়ীভাবে শিশুদের কাউন্সিলিং করার জন্য মনো সহায়তাকারী হিসেবে একটি কাজ পান। কিন্তু শুধু মা যৌ’নকর্মী হওয়ায় স্বপ্নার কাঙ্ক্ষিত ভালো কোনো সরকারি-বেসরকারি চাকরি এখনো জোটেনি বলে তিনি জানান।

কেকেএস সেফহোমের কর্মকর্তা ফকির আমজাদ হোসেন জানান, শুধু স্বপ্না নয়, এরকম শতাধিক যৌনকর্মীর মেয়ে তাদের হোমে থেকে বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হয়েছে। যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের পিতৃ পরিচয় নামমাত্র থাকে বা মায়ের ইচ্ছামতো যে কোনো একটি নাম দেওয়া হয়। মায়েদের চেষ্টা ও পরিচয়ে তারা শিক্ষিত হয়। তিনি জানান, বর্তমান আইনে জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে হলে বাবা-মায়ের ভোটার আইডি কার্ড ও জন্ম নিবন্ধন লাগে। পিতা হিসেবে যে নামটি ব্যবহার করা হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার কোনো হদিসই থাকে না।

বর্তমানে যেসব যৌ’নকর্মী মায়েরা তাদের সন্তানকে শিক্ষিত করছেন, তারা জাতীয় পরিচয়পত্র না পেয়ে কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিকভাবে বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে চরম মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছেন। এ সমস্যা সমাধান না হলে তারা আগামীতে চরম সংকটের মধ্যে পড়বে। জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় দেশের বৃহত্তম যৌ’নপল্লি। এখানে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী যৌ’নকর্মীর সংখ্যা দেড় হাজারের অধিক। কিন্তু বাস্তবে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এসব যৌ’নকর্মীদের বিভিন্ন বয়সের শিশুসন্তান রয়েছে সহস্রাধিক। এসব শিশুরা পিতৃপরিচয় দিতে না পারায় এদের জন্মনিবন্ধনে জটিলতার পাশাপাশি পাচ্ছে না জাতীয় পরিচয়পত্র।

এতে স্বল্পসংখ্যক শিশু লেখাপড়া শিখেও সমাজে পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে সমাজের মূল স্রোতধারায় আসতে পারছে না। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আজিজুল হক খান মামুন বলেন, যৌ’নপল্লিতে জন্ম নেওয়া বেশ কয়েকজন শিশু লড়াই-সংগ্রাম করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু বাবার সঠিক পরিচয় না থাকায় তাদের নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি তিনি নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।


Leave a Reply

Your email address will not be published.