দুই লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে আ’লীগ

দুই লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে আ’লীগ

রাজনীতি: দুইটি লক্ষ্য সামনে রেখে আপাতত সামনে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। প্রথমত, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং দ্বিতীয়ত, দলের জাতীয় সম্মেলন। নির্বাচনী প্রচারণায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য,

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে কাজে লাগানো হবে। এরই মধ্যে নেতাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা কি হবে তার নির্দেশনা দেয়া শুরু হয়েছে। করোনার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল

তা কাটিয়ে উঠতে আগেভাগেই দলকে প্রস্তুত করার কৌশল হিসেবে এসব পরিকল্পনা করা হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের অন্তত ছয় মাস আগে নির্বাচনমুখী দলগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করে। বিশেষ করে জেলায় জেলায় সভা ও সমাবেশ ডাকে। আওয়ামী লীগের দু’জন প্রেসিডিয়াম সদস্য,

একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যে ধরনের রাজনীতি চর্চা হয় তা করোনার কারণে করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বড় পরিসরে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি। এতে নেতা-কর্মীদের মাঝে এক ধরনের শৈথিল্য দেখা দিয়েছে।

এটা কাটিয়ে তুলতে রাজনীতির চর্চাটা চাঙ্গা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাছে বড় কর্মসূচির দাবি জানিয়ে আসছেন। সামনে যেহেতু নির্বাচন সেই নির্বাচনকে লক্ষ্য করে শিগগিরই বড় কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা বলেন, এতে দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা দেখা দেবে। আবার নির্বাচনে দলের প্রচারণাও শুরু হবে। নির্বাচন ইস্যুতে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ চায় সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হোক।

বিএনপি’র জন্ম পেছনের দরজা দিয়ে। তারপরও আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। এদিকে শনিবারের বৈঠকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, গণতান্ত্রিক ধারাটা যাতে অব্যাহত থাকে। বারবার বাংলাদেশে অনেক ধাক্কা গেছে। বোধ হয় এই প্রথম ২০০৯ সাল থেকে আমরা ২০২২ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে পেরেছি বলেই দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হয়েছে। এটা হলো বাস্তবতা।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হওয়া নানা ষড়যন্ত্রের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে। আর নেতৃত্ব সেখানেই আপনারা বেছে দেবেন যাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকবে, বিশ্বাস থাকবে। এই কথাটা মনে রাখতে হবে।

কারণ আমরা জনগণকেই বিশ্বাস করি। জনগণের ওপরই আস্থা রাখি আর জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হয়েই কিন্তু আমরা বারবার ক্ষমতায় এসেছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শেষের দিকে অথবা ২০২৪ সালের প্রথম দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আর দলটির

২২তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এ বছরের ডিসেম্বরে। এই দুইটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে গত শনিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী সংসদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এখন থেকেই সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জানা গেছে, দিনক্ষণ নির্ধারণ না হলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যথাসময়ে অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যেই দলের জাতীয় সম্মেলন শেষ করতে চায় আওয়ামী লীগ প্রধান। জাতীয় সম্মেলনের পুরোদমে প্রস্তুতি নেয়ার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অবশ্য মে, জুন, জুলাই ও আগস্ট কেটে যাবে নিয়মিত দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে। এ মাসের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ও ১১ জুন কারামুক্তি দিবস, ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি অনাড়ম্বর পরিবেশে এবং আগস্ট মাসজুড়ে শোকের মাসের কর্মসূচি ভাবগম্ভীর্যের সাথে পালন করবে দলটি।

এরপর দলের জাতীয় সম্মেলন শেষ করেই ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে পুরোদমে আঁটঘাঁট বেঁধে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবে ক্ষমতাসীনরা। কার্যনির্বাহি সংসদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হয়েছে।

কিছু কিছু এলাকার জরিপ করিয়ে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজে হাত দিয়েছেন তিনি। জরিপের ফলাফল আসছে। এলাকায় যাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে সম্পর্ক আছে, তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে। সভায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়নের জন্য উপকমিটি গঠন করারও নির্দেশ দেন তিনি। উপস্থিত নেতাদের দলের জাতীয়

সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়ার তাগিদ দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, যথাসময়েই দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগেই সম্মেলনের প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। উপকমিটি গঠন করে কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে এগুলো সম্পন্ন করা হবে। এ সময় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের জাতীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ সব জেলা ও মহানগরের সম্মেলন করার তাগিদ দেন।

কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বৈঠকে মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দলের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী জাতীয় সম্মেলন এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে সারা দেশে। আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ প্রোগ্রাম জোরদার করতে হবে।

দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন এবং জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে সুশৃঙ্খল সুসংগঠিত পার্টি হিসেবে আওয়ামী লীগকে দাঁড় করাতে হবে।পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি এমনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন যেভাবে হয় সেভাবেই হবে। সম্মেলন ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। আমরা মনে করছি নেত্রী যখন তারিখ দেবেন তখনই হবে। এখন থেকেই তিনি গঠনতন্ত্র ঘোষণাপত্রকে আপডেট করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহার, ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র এগুলো তৈরি করার জন্য তিনি এখন থেকেই সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সব দলকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন কার্যনির্বাহী সংসদের নেতারা। সভায় সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপিসহ সব দলকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে দলীয় প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেন। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় আর হবে না।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই সবাইকে জিতে আসতে হবে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হবে। তাদের নির্বাচনে আনার জন্য সব উদ্যোগ নেয়া হবে। বিএনপির সাথে নির্বাচন করেই আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য সম্প্রতি ১৪ দল নিয়ে নানা বিতর্কের বিষয় তুলে ধরে আগামী নির্বাচন জোটগতভাবে হবে কি না দলীয় প্রধানের কাছে জানতে চাইলে তিনি আগামী নির্বাচন জোটগতভাবে হবে বলে জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ১৪ দল আছে, থাকবে। অতীতের মতো আগামী নির্বাচনেও জোটকে সাথে নিয়েই যাবে আওয়ামী লীগ।

কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, করোনা মহামারী স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর প্রথম শনিবার প্রায় ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী সভা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিতভাবেই দলের সম্মেলন হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন উপকমিটি গঠনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা বিএনপিসহ সমস্ত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চাই।


Leave a Reply

Your email address will not be published.