ক্ষমতায় গেলে যা যা করবে বিএনপি, জানালেন ফখরুল

ক্ষমতায় গেলে যা যা করবে বিএনপি, জানালেন ফখরুল

আগামীতে ক্ষমতায় গেলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ সব ধরনের নিবর্তনমূলক আইন ও অধ্যাদেশ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিএনপির আয়োজিত গণমাধ্যম সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন প্রতিশ্রুতি দেন।

ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাস্টসহ যে চারটি আইন করেছে- তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কফিনে পেরেক দেওয়ার মতো।

আমাদের পরিষ্কার ঘোষণা, আমরা সরকার গঠন করলে মুক্ত গণমাধ্যমের অন্তরায় ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’সহ সব ধরনের নিবর্তনমূলক আইন ও অধ্যাদেশ বাতিল করব।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে কোনো বিষয় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা সংস্থা প্রেস কাউন্সিলে ফয়সালা না করে কোনোভাবেই যেন আদালতে মামলা দায়ের করতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, গণমাধ্যমকে স্বাবলম্বী করার জন্য বিএনপি বিজ্ঞাপনের সুষম বন্টনের ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা, প্রচারণা কিংবা টিআরপির ভিত্তিতে গণমাধ্যমগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার চিন্তাও বিএনপির রয়েছে।

দেশের ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে দেশীয় গণমাধ্যমগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, সেটি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড সব গণমাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন ফখরুল।

দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকে গোটা জাতি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আইনের শাসন, মানবাধিকার বলে কিছু নেই। গণমাধ্যমগুলোকে গোয়েন্দা সংস্থাসহ নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই জাতি বা রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে হলে সবার মধ্যে একটা ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। যদি না পারি তাহলে এখান থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো পথ নেই। সেজন্য সাংবাদিকরা তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন, রাজনীতিবিদরা তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন- এর মধ্যে একটা ঐক্য সৃষ্টি করে আমরা যেন দেশে গণতন্ত্রকে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আনতে পারি, সেই উদ্যোগটা গ্রহণ করা উচিত।’

ক্ষমতার পরিবর্তনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা খুব আশাবাদী। বাংলাদেশের মানুষ কখনো পরাজিত হয়নি। টানেলের পেছনে আলো দেখছি বলেই পুনরায় আমরা উৎসাহিত বা উৎফুল­ হচ্ছি তাই নয়। আমরা সব সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করেছি, কাজ করে যাচ্ছি। সরকারে যখন ছিলাম তখনো করেছি, সরকারে নেই এখনো গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের বিজয় অবশ্যই অর্জিত হবে।’

বিএনপির উদ্যোগে ‘গণতন্ত্র হত্যায় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আইন, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভা হয়। মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে এবং দলের প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির পরিচালনায় এতে বক্তব্য দেন, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, দিনকাল সম্পাদক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার, রুহুল আমিন গাজী, এমএ আজিজ, এম আবদুল্লাহ, নুরুল আমিন রোকন, এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, কামাল উদ্দিন সবুজ, বাকের হোসাইন, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, সাংবাদিক নেতা জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, সরদার ফরিদ আহমদ, কাদের গনি চৌধুরী, ইলিয়াস খান, শহীদুল ইসলাম, ইলিয়াস হোসেন, রফিকুল ইসলাম আজাদ, মুরসালিন নোমানী, শফিক আহমেদ প্রমুখ।

এ ছাড়া মতবিনিময় সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার’ প্রকাশিত র‌্যাংকিংয়ে গত ১ বছরে বাংলাদেশ ১০ ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬২তম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রবন্ধে বলা হয়, এর পেছনে নিবর্তনমূলক আইন ও অধ্যাদেশগুলোকে দায়ী। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, আইসিটি অ্যাস্টের পাশাপাশি অতি সম্প্রতি খসড়া হিসেবে জারি করা দ্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন রেগুলেশন ফর ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড ওটিটি প্লাটফর্মস-২০২১, ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কনটেন্টভিত্তিক পরিসেবা প্রদান ও নীতিমালা-২০২১, অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট প্রভৃতির মাধ্যমে গণমাধ্যমকে এমনভাবে চেপে ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে যে তারা শুধুমাত্র সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ১৬ সাংবাদিককে হত্যা ও ১১৪০ জনকে দায়িত্ব পালনের সময় গুরুতর আহত করা হয়েছে। মামলা ও হয়রানির ভয়ে বেশিরভাগ মিডিয়া সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজ্ঞাপন বন্টনের বৈষম্য, বেতন বোর্ড বাস্তবায়নে মালিকপক্ষের অনীহা প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ গণমাধ্যমকর্মীকে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ফলে সৎ ও মেধাবী সাংবাদিকরা ধীরে ধীরে এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা খুবই মারাত্মক। এর কারণ হচ্ছে উইপেন অব ‘ল অর্থাৎ আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। বাংলাদেশে অসংখ্য আইন আছে যা আমাদের দেশে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমের পরিপন্থি। প্রত্যেকটি আইন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে হুমকি স্বরূপ।

তিনি বলেন, আমরা এখন একটা প্রতিকূল একটা পরিবেশের মধ্যে আছি। এ থেকে উত্তরণে দরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ সব আইন সংশোধন অথবা বাতিল করতে হবে। এদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারা যদি গণতান্ত্রিক না হন তাহলে আইন থাকুক বা না থাকুক দেশে ফ্রিডম অব প্রেস কখনো প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে একটা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে কিছু অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাদের অঙ্গীকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আমাদের অতীত আশ্বস্ব হওয়ার মতো পরিস্থিতি নয়, বর্তমান তো নয়ই। স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম বান্ধব ছিল না, এখনো নেই।

বিএনপির আমলে জহুর হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া, একুশে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন মতের পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন উদাহরণও তুলে ধরেন সোহরাব হাসান।

সোহরাব হাসান বলেন, ‘আমরা সবসময় যেন সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারি। আপনাদের (বিএনপি) যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সেই কথা আমরা তুলে ধরব। আবার সরকার যদি অন্যায় সিদ্ধান্ত নেয়, স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নেয়, কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করে বা করে থাকে অবশ্যই তারও প্রতিবাদ করব। আমরা চাইব যে, বিরোধী দলে থাকতে গণমাধ্যমের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের যে সখ্য তৈরি হয়, সেটি যাতে ক্ষমতায় যাওয়ার পর অব্যাহত থাকে।’

সোহরাব হোসেনের বক্তব্য খণ্ডন করে বিএফইউজের একাংশের সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘সোহরাব ভাই সঠিক তথ্য দেননি। সাংবাদিক জহুর হোসেন কারাগারে যাননি। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। একুশে টিভি বিএনপি সরকার বন্ধ করেনি। এটি টেরিস্টোরিয়াল সম্প্রচারের ইস্যুতে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে বন্ধ হয়েছে।’

একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের আমলে সাংবাদিক সাগর-রুনি হ’ত্যাকাণ্ড, দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দায়েরসহ সারা দেশে সাংবাদিকদের নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরেন বিএফইউজের এই শীর্ষনেতা।


Leave a Reply

Your email address will not be published.