হাজী সেলিমের এমপি পদের কী হবে, জানা গেল গোপন তথ্য

হাজী সেলিমের এমপি পদের কী হবে, জানা গেল গোপন তথ্য

দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিম রবিবার (২২ মে) আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

এ প্রেক্ষাপটে তার সংসদ সদস্যপদ নিয়ে কী হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। সংবিধান অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে কোনও সংসদ সদস্যের ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের সাজা হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়া বা থাকার অযোগ্য হবেন।

অবশ্য হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা হাজী সেলিমের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে তার সংসদ সদস্য পদের পরিণতি জানতে অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনও ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। আর সংবিধানের স্প্রিড হলো—বিধান বলে কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না। কেউ সংসদ সদস্য থাকলেও একই কারণে তিনি স্বপদে থাকতে পারবেন না।

দুদকের করা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের যে মামলায় হাজী সেলিমের সাজা হয়েছে, সেটি দায়ের করা হয়েছিল ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে জরুরি অবস্থার মধ্যে। পরের বছর ২৭ এপ্রিল বিশেষ আদালত তাকে দুই ধারায় মোট ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন।

হাজী সেলিম ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি উচ্চ আদালত তার সাজা বাতিল করে রায় দেন। দুদক তখন সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে হাজী সেলিমের আপিল পুনরায় হাইকোর্টে শুনানির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

সেই শুনানি শেষে গত বছরের ৯ মার্চ হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি ধারায় হাজী সেলিমের ১০ বছরের সাজা বহাল রাখেন এবং অন্য ধারায় ৩ বছরের সাজা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। ওই বেঞ্চের দুই বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী এবং একেএম জহিরুল হকের সইয়ের পর ৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।

হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে আগেই বলেছেন, সংবিধানের ৬৬(২-এর ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে, যদি কেউ নৈতিক স্খলনের দায়ে ২ বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হবেন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি যেহেতু দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, তাই এটা তার নৈতিক স্খলন। সে কারণে সাংবিধানিকভাবে তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তার সংসদ সদস্য পদ বাদ হয়ে যাবে। তবে বিষয়টি স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। তাই হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর দুদকের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’

হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজাও হাইকোর্টের রায়ের পরে বলেছিলেন, তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করবেন। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। সুতরাং, তার সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকতে কোনও বাধা নেই। কোনও সংসদ সদস্য গ্রেফতার, আটক বা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে বা মুক্তি পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী তা স্পিকারকে জানাতে হয়। স্পিকার জানার পর তিনি তা সংসদকে অবহিত করবেন। তবে রবিবার পর্যন্ত হাজী সেলিমের রায়ের বিষয়ে সংসদকে আনুষ্ঠানিক কোনও কর্তৃপক্ষ কিছুই জানায়নি। এ বিষয়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা রায়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না। আদালত থেকেও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, হাজী সেলিমের বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলার সময় এখনও আসেনি। তিনি আপিল করতে পারেন। উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে পারেন। সেগুলোর নিষ্পত্তি হওয়ার আগে সদস্য পদ নিয়ে কিছু বলার সময় আসেনি। এছাড়া নিয়ম আছে যে সংসদ সদস্য পদ নিয়ে কোনও বিতর্ক দেখা দিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এর আগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল কুয়েতের আদালতে দণ্ডিত হলে তার সদস্য পদ বাতিল করে সংসদ। অর্থ ও মানবপাচার এবং ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেফতার হন পাপুল। ওই মামলার বিচার শেষে গত বছরের ২৮ জানুয়ারি তাকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন কুয়েতের একটি আদালত। পরে সেদিন থেকেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের কোনও আইনপ্রণেতার এভাবে বিদেশে দণ্ডিত হওয়ার এবং সাজার কারণে পদ বাতিলেরও এটাই প্রথম ঘটনা। পাপুলের এমপি পদ বাতিলকে চ্যালেঞ্জ করে পরে উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করেন তার বোন নুরুন্নাহার বেগম। যদিও সেই আবেদন টেকেনি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.