এজাহারে ঢাবি কর্তৃপক্ষ যা বলেছে

এজাহারে ঢাবি কর্তৃপক্ষ যা বলেছে

মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল ছাত্রদলের।

মৌন মিছিল নিয়ে সেখানে যাওয়ার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে তাদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ।

হামলায় ছাত্রদলের অন্তত ৩০ নেতাকর্মী আহত হন। পরে কার্জন হল এলাকায় সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।

মঙ্গলবারের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এস্টেট কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগটি পরবর্তীতে পুলিশ মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

সরকারি কাজে বাধা, সরকারি কর্মচারীকে মারধর, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ভাঙচুর ও ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলাসহ ৪টি অভিযোগে করা এই মামলায় ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

ঢাবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী এস্টেট ম্যানেজার মো. আলী আশ্রাফ মঙ্গলবার রাত ৯টা ১০ মিনিটে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ এবং পরে মামলা করেন। মামলা নম্বর-২৯/২২৩। পেনাল কোড-১৮৬০।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের ৩৫ জন শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এ সময় বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, একদল দুষ্কৃতকারী লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের সামনে বেআইনিভাবে অবস্থান করছে।

সেখানে তারা সমবেত হয়ে নির্বাচন বানচাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করার অপতৎপরতা শুরু করে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে দুষ্কৃতকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় এসব অস্ত্রধারী ও দুষ্কৃতকারী পুনরায় শিক্ষা ভবনের সামনের (হাইকোর্ট) দিক থেকে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ জন একত্রিত হয়ে কার্জন হলের গেইট দিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে।

এ সময় গেইটে কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরী কামাল হোসেন তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করলে ওইসব সন্ত্রাসী তার ওপর চড়াও হয়। এবং তাকে লাঠি ও রড দিয়ে মাথায় আঘাত করতে গেলে সে হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এতে তার হাত আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও সরকারি কাজে বাধা প্রদানসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীকে আঘাত করে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার কাজসহ নিয়মিত সেবা প্রদানের কাজে ব্যবহৃত ভাড়া করা দুটি সরকারি বিআরটিসি বাস তারা ভাঙচুর করে। এতে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়। এসব সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয় মামলার এজাহারে।

ছাত্রদলের দু’জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের করা মামলায় গত বুধবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, সকল ধরনের দেশীয় ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যেটা গণমাধ্যমের বরাতে পুরো বিশ্ব দেখেছে। আবার আমাদেরকে মামলা-হামলা দিয়ে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রক্টর। তারা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি দেখে থাকেন। গত মঙ্গলবার থেকে গতকাল পর্যন্ত আমাদের ওপর ৭ বার হামলা করা হয়েছে।

আমরা প্রতিটি হামলার ঘটনার বিষয়ে ভিসি এবং প্রক্টরকে জানিয়েছি। তাদেরকে বলেছি, আপনারা শুধুমাত্র ছাত্রলীগের অভিভাবক হয়ে থাকবেন না। আমরা একাধিকবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। আমরা ক্যাম্পাসে যেতে পারছি না। গতকালও আমাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্রসহ হামলা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের হয়ে ভূমিকা পালন করছে। ঢাবি কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা কোনো ন্যায়বিচার পাচ্ছি না। গতকাল ছাত্রলীদের হামলায় আহত ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য সচিব আমানউল্লাহ আমান বলেন, আমাদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। আবার আসামিও হলো ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদেরকে হামলার ফুটেজ সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের কথার কর্ণপাত করছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, এ বিষয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিমধ্যে মামলা করেছেন। দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান ওই ছাত্র নেতা।

মামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী মানবজমিনকে বলেন, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যা ঘটেছে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। শিক্ষকদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক এবং সাংবিধানিক নির্বাচন হচ্ছিল। শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে সকল কিছুই স্বাভাবিক চলছিল। কিন্তু গত ৪০ বছরের ইতিহাসে কখনো দেখিনি কেউ এভাবে লাঠিসোঁটা সজ্জিত হয়ে নির্বাচনকে নষ্ট করতে ভবনে প্রবেশ করে এবং বহিরাগতরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিঘ্নিত করতে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা করেছে। কার্জন হলের একজন নিরাপত্তাকর্মীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে বাধা দেয়া হয়েছে। জাতীয় সম্পদ নষ্ট করেছে। বাইরে থেকে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকার ঘটনা ঘটেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া করা বিআরটিসি’র দুটি বাস ভাঙচুর করেছে। আমাদের অভিযোগের তালিকায় কোনো দল বা সংগঠনের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে এই চারটি অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছি। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মওদুত হালদার বলেন, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সুত্রঃ মানবজমিন


Leave a Reply

Your email address will not be published.