প্রবাসী আয়ের জাদু শেষ হয়ে গেছে

প্রবাসী আয়ের জাদু শেষ হয়ে গেছে

আলোচিত: দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সংকট এখন বিকাশমান। অর্থনীতি যে চাপে তা বলার অবকাশ রাখে না। আগে আর্থিক খাতে দুর্বলতা থাকলেও বৈদেশিক খাত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক খাতও দুর্বল।

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়েছে। এমনকি রপ্তানি আয়ও কমে গেছে আকস্মিকভাবে। অথনীতিবিদরা মনে করেন, বর্তমানে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে এখন আর শুধু খাত বিশেষে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ নিলে হবে না,

দরকার সমন্বিত প্যাকেজ পরিকল্পনা। তা না হলে অর্থনীতিতে সংকট আরও প্রকট হতে পারে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি’র বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন,

এই মুহূর্তে শুধু খাত বিশেষে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ও অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়ার সময় আর নেই। এখন সময় সমন্বিত পরিকল্পনার। মূল ধারার একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় প্রখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ বলেন,

আমি আগেও বলেছিলাম প্রবাসী আয়ের যাদু শেষ হচ্ছে। এখন যাদু তো শেষ! প্রবাসী আয় এখন কোনো মাসে বাড়বে কোনো মাসে কমবে। এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে- আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি,

রেমিট্যান্সের যাদু শেষ হচ্ছে। আজ থেকে ৬ মাস আগেই বলেছি। তখন থেকেই পদক্ষেপ নেয়া যেতো, বিদেশে লোক পাঠানোর খরচ কমানো যেতো। তিনি বলেন, এখন প্রবাসী আয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াতে অনেক বেশি চলে গেছে।

সরকারি হিসাবের বাইরে হুন্ডি দিয়ে আসছে। এটা ফিরিয়ে আনতে হলে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা কোনো দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ব্যবস্থা না। টাকার বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখাটাই কাজের কথা। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এখন অর্থনীতি যে চাপের মধ্যে আছে এটা সবাই বুঝে। গুরুত্বপূর্ণ হলো- আগে আমার আর্থিক খাতে দুর্বলতা ছিল এবং বৈদেশিক খাত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক খাতও দুর্বল হয়ে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুই ইঞ্জিনের মধ্যে এক ইঞ্জিন একটু শক্তিশালী ছিল, এখন দু’টো ইঞ্জিনই দুর্বল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতিতে একটি সংকট বিকাশমান। এখন এটার সমাধান হলো- এই সংকটকে স্বীকার করে নিয়ে সর্বমুখী যথাপযুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে একটু মুদ্রানীতি ঠিক করলাম, এখানে একটু এলসি মার্জিন বাড়ালাম এগুলো বিষয় না, এখানে একটি সমন্বিত প্যাকেজ পরিকল্পনা লাগবে। একটি স্থিতিকরণের ৩ বছর মেয়াদি প্যাকেজ পরিকল্পনা লাগবে। এই মুহূর্তে খাত বিশেষে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ নেয়ার সময় আর নেই। এখন সমন্বিত পরিকল্পনার সময়। এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এখন শুধু রেমিট্যান্স আয়ের বিষয় না, এখন সামগ্রিক চলতি হিসাবের ভারসাম্যের হিসাবের বিষয়। সুতরাং শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক না, এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ- এদের মিলে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নীতির সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। এ রকম বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন, অপর্যাপ্ত পদক্ষেপে কোনো কাজ হবে না। এতে শুধু অপচয় হবে। এখানে নীতি নেতৃত্বের দুর্বলতা আছে। আমরা তো ঘটনার পেছনে ছুটছি, ঘটনার আগে নেতৃত্ব দিতে পারছি না।

টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার নমনীয় ও বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা উচিত উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, আমরা এটাকে বলি কার্যকর বিনিময় হার। যেটা এখনো সরকারি হিসাবে টাকা অতিমূল্যায়িত রয়েছে। সুতরাং কৃত্রিমভাবে ডলারের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে এটাকে কার্যকর করা যায় না। এটার ফলে বিকল্প বাজার সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংকের মাধ্যমে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসে। তাই বিনিময় হার সমন্বয় করা উচিত বাস্তবতার নিরিখে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে দর নির্ধারণ করে দেয় সেটা বাস্তবসম্মত নয়। উদাহরণ টেনে এই গবেষক বলেন, নদীতে যখন জোয়ার আসে তখন খড়কুটো দিয়ে বাঁধ দিতে পারেন না, ওটা ভেসে যাবে। অর্থাৎ চাহিদা এতবেশি যে, সেটার প্রশাসনিক ব্যবস্থার অর্থনীতির মৌল পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কোনো সময় এটা কার্যকর হয় না।


Leave a Reply

Your email address will not be published.