এজন্যই তিনি কাপুরুষ হননি

এজন্যই তিনি কাপুরুষ হননি

মুখে তিনি বলেছেন, অস্বস্তির কথা। কিন্তু কয়েকটি অনলাইনে তার ‘ভাষণ’ পড়ে তেমনটা মনে হলো না।

অস্বস্তি, অনুশোচনা কিছুই নেই তার মধ্যে। এমনটা কি কেউ আশা করেছিল! তবে এরপরও আশ্চর্য হওয়ার বিষয় আছে।

কেন যেন মনে হলো ভদ্রলোকের জ্ঞান ফিরছে! কিছুটা হলেও। সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। সিইসি থাকার সময় তিনি ছিলেন অটল, অবিচল।

চশমা পরেও কোথাও কোনো অনিয়ম খুঁজে পেতেন না। স্বস্তি আর উচ্ছ্বাস সবসময় সঙ্গী ছিল। অথচ শনিবার চ্যানেল আই অনলাইনের শিরোনাম বলছে,

‘বিএনপি ভোটে না আসলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না: কে এম নূরুল হুদা।’ হাতে গায়েবি ভোটের দাগ নিয়েও আজ এ কী কথা তার মুখে! তিনি আরও কী সবক দিয়েছেন সে আলোচনায় একটু পরে আসছি।

গুগলে খোঁজ করতেই পাওয়া গেল মজার একটি খবর। বিগত সংসদ নির্বাচন নিয়ে ৩১শে ডিসেম্বর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তৎকালীন সিইসি কে এম নূরুল হুদা।

সেদিন কী বলেছিলেন তিনি। প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ভোট নিয়ে তিনি তৃপ্ত-সন্তুষ্ট।

ভোটে কোনো অনিয়ম হয়নি। ভোটে তারা লজ্জিত নন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। আজ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ভোটগ্রহণ পরবর্তী ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

সাংবাদিকরা কে এম নূরুল হুদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, নির্বাচন যেভাবে হয়েছে তাতে কি আপনারা সন্তুষ্ট নাকি লজ্জিত? প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বিপুল ভোটার উপস্থিতি ছিল। তারা বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে ভোট দিয়ে নতুন সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে জাতি গতকাল ভোট উৎসবে মেতেছিল।

দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে সে জন্য আমরা দুঃখিত। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, একটি দল চার লাখ ভোট পেয়েছে, আরেক দল ৪০০ ভোট পেয়েছে, শক্তির দিক থেকে দুটি সমান সমান দলে এত পার্থক্য কীভাবে হয়? এ ছাড়া বিরোধীরা নির্বাচন বাতিল দাবি করে নতুন নির্বাচনের দাবি করছেন। সিইসি বলেন, ‘এটা আমাদের কাছে কিছুই না। জনগণ ভোট দিয়েছে তাই ভোটের এত পার্থক্য। সুতরাং, নতুন করে আমরা নির্বাচন দেব না। গণমাধ্যম, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় আমরা দেখেছি, কোনো অনিয়ম হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো অনিয়মের অভিযোগও পাইনি। পেলে তদন্ত করে দেখবো। আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য।’

তো সেই নূরুল হুদা গতকাল শনিবার এফডিসিতে আয়োজিত ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সম্ভব’ শীর্ষক ছায়া সংসদ আলোচনায় কথা বলেন। চ্যানেল আইয়ের অনলাইনে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী এতে তিনি বলেন, বিএনপি আগামী ভোটে না আসলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগ না করে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে এসময় তিনি বলেন: দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, পদত্যাগ কাপুরুষের কাজ বরং দায়িত্বে থেকে দায়িত্ব পালন করা উচিত। বন্দুকের নল এবং লাঠি উঁচিয়ে এদেশে ভোট হয়, এই কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানবজমিন অনলাইনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সিইসি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো চাপ সৃষ্টি হয়নি। তবে জাতীয় নির্বাচনের সময় কোথাও কোথাও শতভাগ ভোট কাস্ট হওয়ায় অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল। ইভিএমে এক জায়গায় ত্রুটি আছে এমন মন্তব্যও আসে সাবেক এই সিইসি’র কাছ থেকে।

বাংলাদেশের ইতিহাস নানা কিসিমের নির্বাচন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার দেখেছে। কেউ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে প্রশংসিত হয়েছেন। গায়েবি ভোটের কারণে কেউ হয়েছেন সমালোচিত। কাউকে আবার সংসদ নির্বাচনের আগেই পদত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছে। এরমধ্যেও নিশ্চিতভাবেই স্বতন্ত্র একটি অবস্থানে থাকবেন কেএম নূরুল হুদা। তার সময়ে ভোট ব্যবস্থা যে কেবল ভেঙে পড়ে তাই নয়, এটি নিয়ে কখনো তাকে মন খারাপ করতেও দেখা যায়নি। যতোই বলা হোক, নির্বাচন কমিশন চাইলেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, আসলে তা সত্য নয়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরও থাকে বড় ভূমিকা। সেক্ষেত্রে নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন কখনো স্বাধীন নির্বাচনের চেষ্টা চালিয়েছে তাও দৃশ্যমান হয়নি। যদিও সে কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদার ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম।

পশ্চিমা দুনিয়াতে এটি বেশি দেখা যায়। ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে চলে যাওয়া। এটি পদত্যাগী ব্যক্তিকেই সম্মানিত করে। আমাদের এখানে তার রেওয়াজ খুব একটা নেই। থাকলে হয়তো কে এম নূরুল হুদার মতো মানুষ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারতেন না। তবে তার কথা অনুযায়ী, পদত্যাগ কাপুরুষের কাজ। তিনি কাপুুরুষ নন। তাই পদত্যাগ করেন নি। বাহ! কী চমৎকার কথা। শতভাগ ভোট নিয়ে সাবেক সিইসি’র অস্বস্তির বিষয় দেখেও চমকিত না হয়ে পারা যায় না। তাহলে তারও অস্বস্তি হয়! সত্যি? তবে বিগত সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনি কি এখনো আগের মতোই তৃপ্ত? লজ্জিত নন? এ কেমন আশা তার কাছে!


Leave a Reply

Your email address will not be published.