লাইভ করা ইয়াসিনের সন্ধান পাননি স্বজনরা

লাইভ করা ইয়াসিনের সন্ধান পাননি স্বজনরা

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় হতাহত ও নিখোঁজের তালিকায় ফেনীর তিনজন রয়েছেন।

এদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস কর্মী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বিএম কন্টেইনার ডিপোর শিফট ইনচার্জ শাহদাত উল্যাহ মজুমদার নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ ইয়াসিন।

নিহত ফায়ার সার্ভিস কর্মী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের হাজী সুলতান আহমেদ ভূইয়া বাড়ির মাস্টার আবু ইউসুফের ছেলে। তিনি সীতাকুন্ড ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে কর্মরত ছিলেন।

তার চার বছরের একটি কন্যা ও ২ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। নিহত বিএম কন্টেইনার ডিপোর শিফট ইনচার্জ শাহাদাত উল্যাহ মজুমদার ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ আনন্দপুর গ্রামের আমিন উল্যাহ মজুমদারের ছেলে। তিন ভাইবোনের মাঝে শাহাদাত মেঝ। তার আড়াই মাসের কন্যা সন্তান রয়েছে।

নিখোঁজ স্পেক্ট্রা কোম্পানি কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ ইয়াসিন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড গোসাইপুর গ্রামের মো. খোকা মিয়ার ছেলে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে ইয়াসিন মেঝ।

সীতাকুন্ডে কন্টেইনার ডিপোতে আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস কর্মী ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের হাজী সুলতান আহমেদ ভূইয়া বাড়ির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (৩৭) নিহত হয়েছে। তিনি সীতাকুন্ড ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জেঠাতো ভাই আবুল কালাম আজাদ জানান, দুর্ঘটনার সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আগুন নিয়ন্ত্রনে কাজ করছিলেন। বিস্ফোরণের সময় তিনি নিহত হয়। শনিবার রাতে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন না ধরায় রোববার সকালে স্বজনরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। সোমবার সকালে মুঠোফোনে আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মরদেহ সোমবার সকাল পর্যন্ত স্বজনদের বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। কবে নাগাদ মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হবে তাও তারা নিশ্চত না। তবে মরদেহকে রাষ্ট্রীয় মর্যদায় গার্ড অব অনার দেয়া হবে বলে তিনি জানতে পেয়েছেন।

নিহত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা মাস্টার আবু ইউসুফ বলেন, প্রায় ১১ বছর আগে ছেলে ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলো। ছেলের আয়ের উপর তাদের সংসার চলছিলো। এভাবে ছেলে তাদের ছেড়ে চলে যাবে তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। এদিকে ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়েছে পড়েছেন মা রোশনা আরা বেগম। বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী। বাবার প্রতিক্ষায় নিষ্পলক চোখে চেয়ে আছে অবুঝ দুই সন্তান। পুরো বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের মাঝে যেন কান্নার রোল পড়েছে। স্বজনদের সান্তনা দিতে ছুটে এসেছে আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা। এদিকে সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে লাগা আগুনে নিহত ফেনীর ফুলগাজীর মুন্সিরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ আনন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত মজুমদারের মরদেহ রোববার মধ্যরাতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। নিহতের স্বজনরা জানান, শাহাদাতের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে রোববার রাতে বাড়িতে আনার পর রাত সোয়া ১২ দিকে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ উত্তর আনন্দপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার শাহাদাত মজুমদারের মরদেহ শনাক্ত করে স্বজনরা। দাফন হলেও শাহাদাত মজুমদারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মা-বাবাসহ স্বজনরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ছেলের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বাবা-মা। নিষ্পলক চোখে বাবার প্রতিক্ষায় শাহাদাতের আড়াই মাসের সন্তানটি। বিলাপে কাঁতরাচ্ছে স্ত্রী আয়েশা।

নিহতের মা শাহানা আক্তার বলেন, ফেনী সরকারি কলেজে স্নাতক পাশ করেই বিএম কন্টেইনার ডিপোর শিফট ইনচার্জ হিসেবে চাকুরিতে যোগ দেন শাহাদাত। বৃহস্পতিবার ছুটিতে বাড়িতে এসে শনিবার সকালে কাজে ফিরে যায় শাহাদাত। শনিবার রাতে তার ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরে যান শাহাদাত। ডিপোতে আগুনের খবর পেয়ে বাসা থেকে ডিপোতে ফিরে আসেন। এসময় পরিবারের সাথে মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় বিস্ফোরণের শব্দ শুনে স্বজনরা। এরপর থেকেই তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো স্বজনদের। ওদিকে সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় সোমবার সকাল পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ ইয়াসিন। রোববার রাতে ইয়াসিনের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার মা কোকিলা আক্তার ছেলের সন্ধানে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চার বোনও উপার্জনক্ষম ভাইয়ে সন্ধানে প্রহর গুনছে। নিখোঁজ কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ ইয়াসিনের জেঠাতো ভাই মোহাম্মদ নাহিদ জানায়, সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে আগুন লাগার পর বাড়িতে ফোন করে বিষয়টি স্বজনদের জানায় ইয়াসিন। কথা শেষে করে তিনি মোবাইলের মাধ্যমে ফেসবুকে আগুন লাগার ঘটনাটি লাইভ করতে ছিলো। এসময় বিস্ফোরণ হলে তার লাইভ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে তার আর কোন সন্ধান পাচ্ছিল না স্বজনরা। সোমবার ভোরে মোহাম্মদ নাহিদ মুঠোফোনে প্রতিবেদককে আরও জানায়, রোববার সকাল থেকে ইয়াসিনের বাবা খোকা মিয়াসহ স্বজনরা সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপো ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ করেও তার কোন সন্ধান পাননি। এখনও স্বজনরা হাসপাতালে অবস্থান করছে। কেউ তার সন্ধান পেলে ০১৮৮৩২৬৯৭৮৫ পেলে এই নম্বরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেছেন। এদিকে কান্না জড়িত কন্ঠে মুঠোফোনে ছেলের ছবি দেখিয়ে মা কোকিলা আক্তার বলেন, শুক্রবার রাতে ছেলের সাথে সবশেষ কথা হয়েছে। এর পর তার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। আগুনের ঘটনাটি ফোন করে বোনদের জানালেও ঘুমিয়ে পড়ায় মায়ের সাথে তার কথা হয়নি। যেভাবেই হোক ছেলেকে জীবিত ফিরে পেতে আকুতি জানিয়েছেন মা কোকিলা আক্তার।


Leave a Reply

Your email address will not be published.