সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে জামায়াত

সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে জামায়াত

প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতায় নানা বাধা পেলেও আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়তে বিএনপির সংলাপের উদ্যোগকে সতর্কভাবে দেখছে দলটি।

আশু ভবিষ্যতে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের জন্যও তৈরি হতে বিশেষভাবে অঙ্গসংগঠন ছাত্রশিবিরকে দল থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ হঠাৎ ঝটিকা মিছিল করতে শুরু করেছে ছাত্রকর্মীরা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য দলটি নিন্দিত। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারে দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতার ফাঁসি হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে দলটি গভীর সংকটে কোণঠাসা অবস্থায়।

দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি জামায়াতের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিএনপির সংলাপ, সরকারবিরোধী আন্দোলন, আগামী নির্বাচন, জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে নেতারা দীর্ঘ আলোচনা করেন। ওই বৈঠকে দলটির নিবন্ধন, দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্দোলনের জন্য দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।

জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ সমকালকে বলেছেন, বিএনপির সংলাপকে ২০ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে তাঁরা ইতিবাচক রূপেই দেখছেন। তাঁর ভাষায়, ‘দেশের রাজনীতিতে কৌশলের নামে এত অপকৌশল রয়েছে যে সব সময়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এর পরও আমরা বিশ্বাস করি, দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে কোনো দলই বাইরে থাকবে না।’

তিনি বলেন, তাঁরা জোটবদ্ধ রাজনীতি করছেন। জোটের মাধ্যমেই তাঁরা আগামী নির্বাচন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। জোটে আসন বণ্টন হবে বলে আশা করেন। এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। দলটির নেতারা জানান, সরকার পতনের আন্দোলনে বিরোধী দলগুলো যদি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়; তাহলে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে জামায়াতের সমস্যা নেই। সে ক্ষেত্রে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিস্কারভাবে জানতে চাইবে দলটি। এ ছাড়া জাতীয় সরকারের বিষয়টি নিয়েও দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়েছে। যদি বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হয়, তখন বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

সূত্র জানায়, জামায়াতের ছাত্র সংগঠনকে মানসিকভাবে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ইসলামী ছাত্র ঐক্য এবং সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মতপার্থক্য ভুলে কিছুটা ছাড় দিয়ে ঐক্য গড়তে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন সংগঠনের নেতারা। তবে এ ক্ষেত্রে ছাত্র ঐক্য গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ পরিষদ আইন একটি জটিলতা তৈরি করছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে হলেও এবং ভিন্ন নামে হলেও যে কোনো প্রক্রিয়ায় তাঁরা এ ঐক্য গড়তে চান।

বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক: সূত্র জানায়, স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। কিন্তু ভোটের সমীকরণে জামায়াতকে যেমন ছাড়তে পারছে না, তেমনি জোটেও রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোটের মিত্রের সঙ্গে এমন টানাপোড়েন সম্পর্কের মধ্যে চলমান সংলাপে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সবার সঙ্গেই বৈঠক হবে। জামায়াতের সঙ্গে সংলাপ হবে। সবার সঙ্গেই তো কথা বলতে হবে। আর ২০ দলীয় জোট তো তাঁরা এখন পর্যন্ত বিলুপ্ত করেননি। এই জোটের কী হবে, সেটা এই আলোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্যে জামায়াত নেতারা উৎসাহিত। এটাকে তাঁরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। জামায়াত নেতারা মনে করছেন, সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য একটাই; তা হচ্ছে- বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পতন। এ লক্ষ্যে রাজপথে সব জোট বিলুপ্ত করে যদি যুগপৎ আন্দোলনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাতে সমর্থন থাকবে জামায়াতের। এ প্রক্রিয়ায় বিএনপির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও মজবুত করতে চাইছেন। এ লক্ষ্যে শুধু দু’দলের মধ্যেই যোগাযোগ সীমাবদ্ধ না রেখে বিএনপির ছাত্রদলসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

নিবন্ধন নিয়ে হতাশা: দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের মাঠে সরব না থাকলেও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জামায়াত। এর অংশ হিসেবে সারাদেশে সংগঠনকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কিন্তু দলের নিবন্ধন না থাকায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। নিবন্ধন ফিরে পেতে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েও লাভ হয়নি। এবারও নতুন নির্বাচন কমিশনের কাছে নিবন্ধন ফিরে পেতে আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগে আদালতের রায়ের কপি, নিবন্ধন নিয়ে মামলার সর্বশেষ অবস্থান- এসব বিষয়ে অবহিত করা হবে।

দলটির নেতারা মনে করছেন, আইনিভাবে তাঁদের নিবন্ধন এখনও বহাল রয়েছে। তবে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের নিবন্ধন ফেরত দেওয়া নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনেও তাঁদের স্বতন্ত্রভাবে কিংবা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করতে হতে পারে।

টার্গেট ১০০ আসন: দলীয় নেতারা জানান, আন্দোলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে সারাদেশের ১০০ আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত। একসময় যাতে এই ১০০ আসন সমমনা বড় দলের সঙ্গে দরকষাকষিতে ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি রাজনীতিতে প্রভাববিস্তার করে, সে লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নিচ্ছে তারা। এ ক্ষেত্রে যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, রংপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেটের বিভিন্ন আসন বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে জামায়াতের অবস্থান আরেকটু শক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নেতারা জানান, এ বিভাগে একটি মাত্র আসন পিরোজপুর-১ থেকে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী নির্বাচন করেন। জামায়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আসনটি ব্যক্তি সাঈদীর কারণে জামায়াত পায়। এ ছাড়া পিরোজপুর-৩ ও বরগুনা-২ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়েও ভালো ফল পায়নি দলটি। এ আসনগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছে তারা।

সরকার বিষয়ে সতর্ক : জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে তাঁদের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে আসার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, আবদুল খালেক মণ্ডলসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতার মামলার সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তবে দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে সবাই মতামত দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠার পর জামায়াতের এত বড় ক্ষতি আর হয়নি, যা আওয়ামী লীগ করেছে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিসহ অনেক নেতাকর্মীকে হারাতে হয়েছে এ সময়ে। তাই আওয়ামী লীগের ফাঁদে আর পা দেবেন না তাঁরা। যদিও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেছেন, এ রকম কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। সরকারের কোনো মহল তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিনা, তা তাঁর জানা নেই। তবে দলীয়ভাবে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি- এটা নিশ্চিত। জামায়াত নেতারা যেটা দাবি করেছেন, এর সত্যতা সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।


Leave a Reply

Your email address will not be published.