সিঙ্গাপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন যাবে ইউরোপে

সিঙ্গাপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন যাবে ইউরোপে

শফিকুল ইসলাম। এক সময় ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। বর্তমানে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠায় আগের প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে বাদ দেয় সরকার। তার স্থলে ২০১১ সালের নভেম্বরে নিয়োগ পান শফিকুল ইসলাম।

অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর তাকে চুক্তিভিত্তিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে রেখে দেওয়া হয়।

এরপর আরও চার দফা চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে নির্মাণকাজের পুরোটা সম্পন্ন হয়েছে শফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে।

বড় স্থাপনা নির্মাণে তার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সততার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রশংসিত হয়েছেন। এজন্য পদ্মা সেতুর শেষ পর্যায়ে এসে সরকার নতুন কাউকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে চায়নি।

জাগো নিউজ: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দক্ষ চালকের মতো প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেন, কেমন লাগছে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা সেতু নির্মাণের বন্দরে পৌঁছাতে পেরেছি এটাই আমাদের প্রাপ্তি। সমস্যামুক্ত বা দুর্ঘটনামুক্তভাবে নদী পারাপার করা যাবে এটা বড় পাওয়া। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এটার বিশাল গুরুত্ব আছে। শেষ পর্যন্ত বন্দরে পৌঁছাতে পেরেছি এতে অনেক ভালো লাগছে।

জাগো নিউজ: সেতু বাস্তবায়নে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল?

শফিকুল ইসলাম: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক দিয়ে আমরা বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। এরকম জটিল প্রকল্প পৃথিবীতে খুব বেশি হয়নি। এমন নদী পৃথিবীতে হয়তো দু-একটা আছে, যেখানে এখনো সেতু হয়নি। কাজেই আমরা একটা উল্লেখযোগ্য কাজ করে সফল হয়েছি বলে মনে করি।

জাগো নিউজ: সেতুর অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ কোনটা আপনার দৃষ্টিতে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা কোনো চ্যালেঞ্জকে ছোট মনে করিনি। ছোট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। কাজগুলো আমাদের ধাপে ধাপে করতে হয়েছে। কোনো চ্যালেঞ্জকে খাটো করা যায় না। যখনই সমস্যা আসছে তখনই সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। নিজেরা না পারলে বিশেষজ্ঞ ও প্যারালাল এক্সপার্টের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা চেষ্টা করেছি এটাকে ওভারকাম করার জন্য, যাতে আমাদের কোনো সমস্যা না হয়।

জাগো নিউজ: সেতু রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটা কীভাবে দেখছেন?

শফিকুল ইসলাম: কথা সত্য, জিনিস তৈরি করা সহজ কিন্তু ধরে রাখা কঠিন। এখানে সেতুর আয়ু মিনিমাম ১০০ বছর নির্ধারণ করেছি। একটা শর্ত আছে, তা হলো এটা রেগুলার রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এখানে সেতু ও নদীশাসনে গুরুত্ব দিতে হবে। দুটোই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এ কাজে প্রচুর লোকবল ও অর্থ লাগবে। এটা হলে সেতু থেকে সঠিক সেবা মিলবে। তা না হলে আমরা যে ১০০ বছর বলছি তা হবে না।

আমরা যমুনা সেতু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করছি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে। এখানেও তাই করতে হবে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কিন্তু ১০০ বছর পার হয়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্যই এই ব্রিজ শত বছর সেবা দিয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ প্রধান শর্ত। আমরা রক্ষণাবেক্ষণে ম্যানুয়ালি দিয়েছি কোন কাজটা কখন করতে হবে। বর্ষাকালে প্রতিনিয়ত সার্ভে করতে হবে। নদীতে কোথাও কোনো গর্ত হলো কি না। সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করতে হবে, পাশাপাশি সমস্যা সমাধান করতে হবে। এগুলো নিয়মিত করে আসছি, সামনে আরও রক্ষণাবেক্ষণ করবো। রক্ষণাবেক্ষণই প্রধান শর্ত সেতুর আয়ু ১০০ বছর টেকানোর জন্য।

জাগো নিউজ: ঠিকাদার কতদিন রক্ষণাবেক্ষণ করবে? বিশেষ করে চায়না মেজর ব্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি।

শফিকুল ইসলাম: আমাদের সঙ্গে চায়না কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি আছে, ত্রুটি হলে তারা ঠিক করে দেবে কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করবে না। হয়তো সেতুর রং উঠে গেছে, কারণ এক বছরে রং ওঠার কথা নয়, এগুলো করে দেবে। কিন্তু একটা সাইনবোর্ড চুরি হয়ে গেলো, এটা করে দেবে না। সেতু রক্ষণাবেক্ষণ করতে একটা ইউনিট আমাদের কাছ থেকে বুঝে নেবে।

বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানকে। এই দুই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন (কেইসি) ও চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (এমবিইসি)। কোম্পানি দুটি পদ্মা সেতু রক্ষণাবেক্ষণও করবে।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতুতে সড়ক ছাড়া আর কী কী কানেক্টিভিটি থাকবে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা কিন্তু মাল্টিপারপাস সেতু বলছি। এখানে থাকবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট সংযোগ। যেহেতু বিদ্যুৎ লাইন ৪০০ কেভি হাই ভোল্টেজ, আমাদের স্টিল ও কংক্রিটের ব্রিজে ঝুঁকি থাকবে। তাই এটা সেতুর পাশ দিয়ে আলাদাভাবে যাবে। তবে গ্যাস রেললাইনের পাশ দিয়ে ও অপটিক্যাল ফাইবার সেতু দিয়েই যাবে। সব মিলিয়ে আমরা কাজ করছি।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে রেকর্ড কী কী?

শফিকুল ইসলাম: খরস্রোতা পদ্মা নদীতে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। পানিপ্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরই এর অবস্থান। মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে এই সেতুতে। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু তৈরিতে এত গভীরে গিয়ে পাইল প্রবেশ করাতে হয়নি, যা পৃথিবীতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় রেকর্ড হলো ভূমিকম্পের বিয়ারিং সংক্রান্ত। এই সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’র সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

এর পরের বিশ্বরেকর্ড হলো পিলার এবং স্প্যানের মধ্যে যে বিয়ারিং থাকে সেটি। এখানে ১০ হাজার ৫শ মেট্রিক টন ওজনের একেকটি বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে কোনো সেতুতে এমন বড় বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। অন্য রেকর্ডটি হলো নদীশাসন সংক্রান্ত। ১৪ কিলোমিটার (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার মাওয়া প্রান্তে ও ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার জাজিরা প্রান্তে) এলাকা নদীশাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এটাও রেকর্ড।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতুর ব্যয় বাড়া প্রসঙ্গে কিছু বলার আছে কি না?

শফিকুল ইসলাম: পদ্মা সেতু শুধু সেতু নয়। নদীশাসন, মূল সেতু, পুনর্বাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন ও গ্যাস লাইনও আছে। আমাদের মূল সেতুর কস্ট কিন্তু ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ লাইন আছে সেখানেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। গ্যাস লাইন আছে সেখানেও ৩০০ কোটি টাকার উপরে চলে যাচ্ছে। শুধু ব্রিজে ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা নেই। ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা চলে গেছে। এটা অনেকে বুঝতে পারে না। এটা কিন্তু রেলসেতুসহ, মানে দুইটা সেতু। মেঘনা সেতু একটা, ভৈরব সেতু একটা। পদ্মা কিন্তু দুইটা সেতু। এটা ছয় লেনের সেতু। ট্রেন কিন্তু যাবে ১৬০ কিলোমিটার গতিতে। এত হাইস্পিড ট্রেন যাবে। এটা ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ের একটা অংশ। এই লোডটা সেতুর ওপর দিতে হয়েছে। এই সেতু ১০০ বছরে আর হবে না।

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে আমরা এটা করেছি। সিঙ্গাপুর থেকে যখন ইউরোপে ট্রেন যাবে তখন পদ্মা সেতু হয়ে যাবে। অনেক মালামাল নিয়ে যাবে, সুতরাং হেভি লোডেড সেতু বানানো হয়েছে। বিভিন্ন কারণে এটা করতে হয়েছে। সেতুর খরচ কিন্তু ভুলভাবে দেখানো হচ্ছে। তুলনা করলে বাংলাদেশের অন্যান্য সেতু থেকে খরচ কম। মেঘনা ও দাউদকান্দি সেতুতে কত খরচ করেছি। রেলওয়ে সেতুর খরচ কত? সব মিলিয়ে দেখলে খরচ বেশি হয়নি।

জাগো নিউজ: বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়। আপনি কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আছেন। এ প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন।

শফিকুল ইসলাম: আমি নিজে ইচ্ছে করে এখানে থাকিনি পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হিসেবে। সরকার আমাকে রেখেছে। তবে বলবো এটা সরকারের একটা সুচিন্তিত মতামত। এ বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। যদি প্রকল্প পরিচালকের ধারাবাহিকতা না থাকে তবে প্রকল্প এটা সাফার করে। সরকার একটা আইন করেছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা যাবে না। আইনটা কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না। কিন্তু আমার বেলায় এটা প্রয়োগ হয়েছে। কোনো প্রকল্পেই বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা উচিত নয়।

জাগো নিউজ: বারবার প্রকল্প পরিবর্তনে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হয় কি?

শফিকুল ইসলাম: কী কারণে প্রকল্প চেঞ্জ করা হয়, আমাকে কেন চেঞ্জ করেনি সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে আমি মনে করি প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন না করায় সেতু বাস্তবায়নে সুবিধা হয়েছে। বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে নানা ধরনের সমস্যা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যায়।

[চলবে…]


Leave a Reply

Your email address will not be published.