অভাবের তাড়নায় সন্তানকে দত্তক দিয়ে ৩৮ বছর ধরে অপেক্ষায় মা!

অভাবের তাড়নায় সন্তানকে দত্তক দিয়ে ৩৮ বছর ধরে অপেক্ষায় মা!

দারিদ্রতার মাঝে কোনো রকম টেনেটুনে পার হচ্ছিল দিনমজুর কমিলা ও সকিম উদ্দিন দম্পতি। কিন্তু পারিবারিক অসচ্ছলতার মধ্যে ছেলে সন্তানের আশায়

একের পর এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয় কমিলার। এ নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ লেগেই থাকতো। ৪০ বছর আগে এমন ঘটনার এক পর্যায়ে

স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে ও পারিবারিক অচ্ছলতার কারণে স্ত্রীকে না জানিয়েই একটি মেয়ে সন্তানকে দত্তক দিয়ে দেন বাবা সকিম। এক পুলিশ সদস্যের কাছে দত্তক দেওয়ার পর

থেকে একবার শুধু মেয়ের মুখ দেখতে পেয়েছিলেন মা কমিলা। এর পর থেকে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে মেয়ের অপেক্ষায় দিন পার করছেন এই মা।

কমিলার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে দুই বছর আগে। অতপর তিনিও মৃত্যু শয্যায় শেষ সময় পার করছেন। এমন ঘটনা ঘটেছে দেশের সর্ব উত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের ভজনপুর নিজবাড়ী গ্রামে।

মঙ্গলবার (১৪ জুন) সন্ধায় মায়ের মৃত্যু শয্যার অবস্থার কথা জানিয়ে ৩৮ বছর আগে দত্তক দেওয়া বোনকে ফিরে পেতে বাংলানিউজের সহযোগীতা চান বড় বোন সকিনা (৪৭)। তিনি বলেন, প্রায় ৪০ বছর আগে চতুর্থ বারের মতো মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন মা (কমিলা)। তার নাম রাখা হয় অরিনা। একে একে চার কন্যা জন্ম দেওয়ায় অনেক অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল মাকে। এভাবেই কেটে যায় দুই বছর।

অরিনা যখন মাত্র হাটা চলা শুরু করেছে তখন আবারও শুরু হয় বাবা-মার ঝগড়া। এর মধ্যে মা একদিন অভিমান করে চলে যায় নানার বাড়ি। কিছুদিন পর মা অরিনাকে পাঠিয়ে দেন বাবার (সকিম) কাছে। দু এক দিন যেতে না যেতেই বাবা অরিনাকে বড় আব্বা সপিজুলের (৭৩) উপস্থিতে দক্তক দিয়ে দেন সে সময়ের তেঁতুলিয়া থানায় কর্মরত এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে। কিন্তু দক্তক দেওয়ার বিষয়ে কিছুই জানতেন না মা। এর পর মা বাড়ি ফিরে অরিনাকে দেখতে না পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায় নি। কোনো খেঁজ না পেয়ে পুরো ভেঙে পড়েন মা। এখন জীবনের শেষ সময়টু বিছানাগত হয়েও অরিনার আশায় দিন পার করছেন তিনি।

এদিকে পারিবার সূত্রে আরও জানা গেছে, সে সময় দত্তক দেওয়ার ৪ বছর পরে হঠাৎ একদিন সেই পুলিশ কর্মকর্তা অরিনাকে নিয়ে তার জন্ম দাতা মা-বাবার বাড়িতে আসেন। তখন সন্তানকে দেখে বুকে জড়িয়ে কান্না করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তার মা। পরে সেই পুলিশ অরিনাকে নিয়ে আবার চলে যান। দত্তক দেওয়ার সময়কাল আনুমানিক ১৯৮২/৮৩ সাল থেকে এখনও মা কমিলা সন্তানের অপেক্ষায় দিন পার করছেন। আরেক বোন শিরিনা (৪৫) বলেন, দক্তক নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তার সঠিক নাম- ঠিকানা কিছুই জানতো না পরিবারের কেউ। তবে বাড়ির বড়দের কাছে জানতে পেরেছি সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে মোল্লা নামে জানতো সবাই। অনেকে বলেন তার বাড়ি বগুড়া আবার অনেকে বলেন কুমিল্লা।

তিনি আরও বলেন, দু’বছর হলো বাবার (সকিম উদ্দিন) মৃত্যু হয়েছে। অরিনার পর দুই ভাই ও এক বোনের জন্ম হয়েছে। দক্তক দেওয়া অরিনাসহ পাঁচ বোন দু ভাই আমরা। অসুস্থ মাসহ আমরা সবাই অরিনার জন্য অপেক্ষায় আছি। আমাদের সেই ছোট বোনকে ফিরে পেতে সকলের সহযোগীতা কামনা করছি। সকিমের বড় ভাই সফিজুল ইসলাম (৭৩) বাংলানিউজকে বলেন, পরিবারে দারিদ্রতা ও পরপর চার মেয়ে সন্তানের জন্ম হওয়ায় সকিম বিরক্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। তাদের অনেক বুঝিয়েও কোনো কাজ হয় না। পরে সকিম তার মেয়েকে দত্তক দেওয়ার বিষয়টি জানান। তাকে নিষেধ করা হলেও দারিদ্রতার কথা বলে আমার উপস্থিতিতে তার মেয়েকে দত্তক দিয়ে দেন। তবে দত্তক দেওয়া ওই পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় জানা না থাকায় অরিনার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সায়েম মিয়া বলেন, যেহেতু এটি ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনা তাই অনেক পুরনো ফাইল দেখতে সময় লাগবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.