দল ও মিত্রদের নিয়ে যা বললেন সাক্কু

দল ও মিত্রদের নিয়ে যা বললেন সাক্কু

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর পরাজয়ের নেপথ্য নিয়ে এখন নগরজুড়ে আলোচনা চলছে। টানা দুই মেয়াদের এ মেয়রের পরাজয়ের কারণগুলো নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পরাজয়ের নেপথ্যে কী কারণ ছিল? কেনই বা এত কম ভোটের ব্যবধানে হারলেন তিনি? ভোট চলাকালে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার কথা বলেও রাতে কেনইবা ফল প্রত্যাখ্যান করলেন? দীর্ঘদিনের এ রাজনীতিকের পাশে কেনইবা ছিলেন না তার দল বিএনপি এবং জোটের

শরিক জামায়াতসহ অন্য দলগুলো? নগরবাসী তথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এমন নানা প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্যদিকে প্রার্থী বিজয়ী হলেও নৌকার ভোট কম হওয়ায় নানা হিসাব-নিকাশ কষছেন আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটের এই চিত্র বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলেছে দলটিকে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের এটি ছিল তৃতীয় নির্বাচন। আগের দুই বার ২০১২ ও ২০১৭ সালে সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে। ২০১২ সালে কুসিকের প্রথম নির্বাচনে মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ২৭৩ জন ভোটারের মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭২ জন ভোট দিয়েছিলেন। ভোটের হার ছিল ৭৫ দশমিক ০৬ শতাংশ।

৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন মনিরুল হক সাক্কু। আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজল খান পেয়েছিলেন ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ২৯ হাজার ১০৬। ২০১৭ সালের নির্বাচনে কুসিকে ভোটার ছিল ২ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬। ভোট পড়েছিল এক লাখ ৩২ হাজার ৬৯০। ভোটের হার ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। বিএনপির প্রার্থী সাক্কু ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানার নৌকা প্রতীকে ভোট পেয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট। অর্থাৎ ১১ হাজার ৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী ছিল। তবুও সীমা হেরেছিল বিএনপির প্রার্থীর কাছে। সেময় পরাজয়ের কারণ হিসাবে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে সামনে আনা হয়েছিল।

এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত এবং সাবেক মেয়র সাক্কু। এবার ভোটার ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০। ভোট পড়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৫টি। ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে রিফাত পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট। আর সাক্কু পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৯৬৭। মাত্র ৩৪৩ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন রিফাত। তবে ভোটের হার কমলেও ভোটার সংখ্যা বাড়ায় এবারের নির্বাচনে গত নির্বাচনের চেয়ে প্রায় দুই হাজার ভোটার বেশি ভোট দিয়েছে।

গত নির্বাচনে সীমা পরাজিত হলেও এবারের চেয়ে প্রায় ৭ হাজার ৫৫৩ ভোট বেশি পেয়েছিল নৌকা। বিগত দুই সিটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরেই কুমিল্লায় দলী প্রার্থীর পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনৈক্যের কথা আলোচনায় ছিল। ওই নির্বাচনে সাক্কুর প্রতি কুমিল্লা-৬ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিনের ‘নীরব সমর্থন’ ছিল বলে জনশ্রুতি আছে। তৃতীয় বারের নির্বাচনে এসে জয়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করে।

আফজল পরিবারের বাইরে গিয়ে দলীয় মনোনয়ন দেয় বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠ জন হিসাবে পরিচিত আরফানুল হক রিফাতকে। শুরুতে রিফাত ছাড়াও এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৩ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এর মধ্যে আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমা এবং ছেলে মাসুদ পারভেজ খান ইমরানও ছিলেন। পরে সীমা মনোনয়ন ফরম জমা না দিলেও প্রার্থী হয়েছিলেন ইমরান। যদি পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন তিনি। তবে অভিযোগ ছিল এই মনোনয়ন প্রত্যাশী এসব নেতা এবং আফজল পরিবার রিফাতের পক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিল না। তবে এবার বাহাউদ্দিনের পুরো ‘আশীর্বাদ’ পেয়েছিলেন রিফাত।

নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনা হলেও নির্বাচনের সময় এলাকা ছাড়েননি এই সংসদ সদস্য। তিনি ও তার পক্ষের অনুসসারীরা সবাই রিফাতের পক্ষে মাঠে ছিল।ইভিএম এর মাধমে অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ এ নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে ভোটের ব্যবধান মাত্র ৩৪৩। এই ভোট বিগত নির্বাচনে নৌকার পক্ষে পড়া ভোটের চেয়ে কম হওয়ায় আবারও সেই পুরোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। এদিকে বিজয়ের ভোটের ব্যবধান অল্প হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সেই ১৩ নেতা,

তার পক্ষে কাজ করেনি বলে অভিযোগ করেছিলেন রিফাত। এর বিষয়ে তার কাছে কি সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ আছে-জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মেসেজ নেই। কিন্তু আমি সবাইকে বলব আমরা সবাই জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য। আওয়ামী লীগের জন্য। আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল করি। আমরা সবাই এক জায়গায়, এক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছি। সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই এক জায়গা থেকে কাজ করব।’

কুসিক নির্বাচনে দলীয়ভাবে একক প্রার্থী থাকার পরেও গত নির্বাচনের চেয়ে এবার নৌকার ভোট কমেছে। এর কারণ কী? সামনে জাতীয় নির্বাচন। কুমিল্লায় দলের ঐক্য ও ভোট নিয়ে আপনারা কি নির্ভার? এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন যুগান্তরকে বলেন, বুধবার নির্বাচন হয়েছে। আজই এত কঠিন বিষয়ে সঠিক উত্তর দান দুরূহ। আমরা সব বিষয় নিয়ে স্টাডি করব। সর্বক্ষেত্রেই ঐক্য এবং ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই।

কুসিক নির্বাচনের শুরু থেকে দায়িত্ব পালন করা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সবুর যুগান্তরকে বলেন, এবার ইভিএমের ভোট হয়েছে। এজন্য ভোট পড়ার হার কম ছিল। তাই ভোট কম পাওয়া মানেই এটা বলা যাবে না আওয়ামী লীগের ভোট কমেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই নৌকা জিতেছে। আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর দুজন সদস্য বলেন, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তার আগে কুমিল্লা সিটির মতো বড় নির্বাচন অবশ্যই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জয় যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি নিজেদের মধ্যকার বিরোধ দূর করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জয় পেয়েছি। কিন্তু ‘অ্যালার্মিং’ বিষয় হচ্ছে গতবারের চেয়ে ভোট কমে যাওয়া। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বিষয়টা আমরা অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখব।

এদিকে কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন অনুকূলে রেখেছেন অপর স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। যার ফলে ভোটের মাঠে অনেকটাই দলীয় কর্মী শূন্য ছিলেন সাক্কু। অপরদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট একসঙ্গে করলে বিশাল ব্যবধান হতো। তাহলে কি দলীয় কোন্দলই সাক্কুর পরাজয়ের কারণ?

বিশ্লেষকরা বলছে এবারের নির্বাচনে সাক্কুর পরাজয়ের বড় কারণ হচ্ছে দলীয় কোন্দল। একই দলের একাধিক প্রার্থী। বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী জোটের সমর্থন না পাওয়া। দীর্ঘ ১০ বছর মেয়রের চেয়ারে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা। নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলার অভিযোগ। সরকারি দলের সঙ্গে আঁতাত।

বিগত দুটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা। নগরীর প্রধান সমস্যা যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতা। টেকসই উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হওয়া এবং সবশেষ সরকার দলের মিত্রদের সমর্থন না পাওয়া। সাক্কুর এবারের পরাজয়ের নেপথ্যে এসব বিষয় এখন আলোচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা আরও বলছে, বিগত দুটি নির্বাচনে সাক্কুর জয়ের নেপথ্যে ছিল সরকারদলীয় মিত্রদের ভূমিকা। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাক্কু যেভাবে সহজ জয় লুফে নিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী রিফাত সেভাবে বিএনপির দলীয় কোন্দলকে কাজে লাগাতে পারেনি। তবে এসব প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও সাক্কু অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বলেও আলোচনা হচ্ছে।

এদিকে দল এবং জোটের প্রত্যক্ষ এবং সরকার দলের মিত্রদের পরোক্ষ সহযোগিতা না পেলেও সাক্কু তুমুল লড়াই করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। তিনি তার ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক কাজে লাগিয়েই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের লড়াই করেছেন। অপরদিকে এবারই নির্বাচনে মাঠে এসে ভোটে জিততে না পারলেও প্রচারে চমক সৃষ্টি করেছেন তরুণ মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি প্রায় ৩০ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে অর্জন করেন। তরুণ এ প্রার্থীর পক্ষে পরোক্ষভাবে বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি তারুণ্য এবং ক্লিন ইমেজ কাজ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছে, কায়সারের আরেকটু জোরালো প্রস্তুতি থাকলে ফলের সমীকরণ বদলে যেতে পারত।

বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া বলেন, আমরা দলীয়ভাবে এ নির্বাচন বর্জন করেছি, দুজন নেতা এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের পক্ষে কাজ না করার জন্য নেতাকর্মীদের আগে থেকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার দল বিশ্বাস করে এই সরকার এবং কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না, তাই আমরা এসব নির্বাচন বর্জন করে আসছি।এ বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, নির্বাচন কমিশনের অসহযোগিতার কারণে আমার কয়েক হাজার ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, প্রতিটি কেন্দ্রেই ইভিএমে ছিল ধীরগতি, এটা ছিল নির্বাচন কমিশনের কৌশল, ভোটাররা যাতে সহজে ভোট না দিতে পারে সেই কৌশলে ছিল ইসির, যার ফলে আমার অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেনি। তিনি বলেন, আমার পরাজয়ে কুমিল্লার তারুণ্যের পরাজয় হয়েছে, কুমিল্লাবাসী আকাঙ্ক্ষার পরাজয় হয়েছে।

মনিরুল হক সাক্কু বলেন, আমি হারিনি, আমাকে পরিকল্পিতভাবে পরাজয় দেখানো হয়েছে, উপর মহলের নির্দেশে আমার জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতার কারণে আমার রেজাল্ট ছিনতাই হয়েছে। এজন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাই দায়ী। সাক্কু বলেন, দলের ভোট ভাগ হলেও কুমিল্লার মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে, আমি জয়ী হয়েছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের কারণে ফল ধরে রাখতে পারিনি, আমি আইনী লড়াই করব। সাক্কু বলেন, আমার পরাজয়ের নেপথ্যের বিশ্লেষণগুলো সঠিক নয়। এদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬ জন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ৪ জন, বিএনপির ৩ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২ জন ও স্বতন্ত্র ২ জন জয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের পাঁচজন, বিএনপির দুজন ও স্বতন্ত্র দুজন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.