দুবাইয়ে জিসানের আতিথ্য নিয়ে মুখ খুললেন মুসা

দুবাইয়ে জিসানের আতিথ্য নিয়ে মুখ খুললেন মুসা

রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হ’ত্যা মিশনের নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন দুই পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিক।

এই মিশন সফল করতে তাঁরা ঢাকার অপরাধ জগতের আরেক দুর্ধ’র্ষ স’ন্ত্রাসী সুমন শিকদার মুসাকে দায়িত্ব দেন। আরেকটি বিষয় পরিস্কার হয়েছে, শুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশের সঙ্গে মোটরসাইকেল আরোহী শামীম ছাড়া হ’ত্যা মিশনে অন্য কেউ ছিলেন না।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, কিলিং স্পটে আরেকটি ‘ব্যাকআপ’ পার্টি ছিল। বুধবার একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ওমান থেকে মুসাকে দেশে আনার পর ছয় দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা বিভাগ।

এই হ’ত্যা মামলায় এরই মধ্যে দেশে গ্রেপ্তার আরও দুই সন্ত্রাসী নাসির উদ্দিন ওরফে কিলার নাসির ও মোরশেদুল ইসলাম ওরফে কাইল্যা পলাশকে মুসার মুখোমুখি করে জেরা করা হয়েছে। নাসির ও মোরশেদুল দু’দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, হ’ত্যা মিশনের ১২ দিন আগে ১২ মার্চ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দুবাই চলে যান মুসা।

সেখানে বসেই হত্যার চূড়ান্ত ছক সাজান। এর আগে ঢাকায়ও একাধিক পরিকল্পনা বৈঠক করেন। হত্যা মিশনের আগেই দেশ ছাড়ার কারণ কী- এমন প্রশ্নে মুসার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর মাথার ওপর আরেকটি হত্যা মামলা ছিল। সেটি হলো যুবলীগ কর্মী রিজভী হাসান ওরফে ‘বোঁচা বাবু’ হ’ত্যা মামলা। মুসার আশঙ্কা ছিল, বাবু হত্যায় তাঁর সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে। তাই রায় ঘোষণার আগেই দেশ ছাড়েন। এ ছাড়া আগে থেকে দুবাইয়ের ভিসা ছিল তাঁর। দেশত্যাগের সময় সেটি কাজে লাগান।

অন্য এক কর্মকর্তা জানান, দুবাই গিয়ে জিসানের আতিথেয়তা নেন মুসা। অপরাধ জগতে মুসার গুরু হিসেবে পরিচিত জিসান। দু’জন বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরিও করেন। জিসান যেখানে বাস করেন, তার কাছাকাছি একটি এলাকায় বাস করতেন মুসা। জিসান অনেক আগে থেকেই ভিন্ন আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে দুবাইয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। বাংলাদেশি দুর্ধর্ষ অপরাধী হিসেবে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ রয়েছে। ঢাকার অপরাধ জগৎও নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন তিনি। মুসা এও জানিয়েছেন,

মতিঝিলকেন্দ্রিক আন্ডারওয়ার্ল্ডে অনেক দিন ধরেই জিসান ও ফ্রিডম মানিকের এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। তবে ওই এলাকায় তাদের চাঁদার খাতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান টিপু। এমনকি ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি সাবেক যুবলীগ নেতা খালেদও চাঁদার ভাগ পেয়ে থাকেন। জিসান ও ফ্রিডম মানিকের ক্ষোভ ছিল, খালেদ কারাগারে থাকার পরও তার ভাগ ঠিকঠাক পেলে কেন বঞ্চিত হবেন তারা।গোয়েন্দারা বলছেন, মুসার ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, টিপু আন্ডারওয়ার্ল্ডের টার্গেট হন।

তবে তাদের রাজনৈতিক কোনো নেতা ব্যবহার করে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন কিনা, তা খুঁজে বের করতে নিবিড় তদন্ত চলছে। মতিঝিলকেন্দ্রিক রাজনীতিতে কারা টিপুর বিরোধিতা করতেন আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখতেন, এখন চলছে সেই অনুসন্ধানও। মুসা মূলত জিসান ও ফ্রিডম মানিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে অপরাধ জগতের সঙ্গে রাজনীতি সংশ্নিষ্টদের সেতুবন্ধনকারী হিসেবে কাজ করতেন। ধারণা করা হচ্ছে, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন মানিক। তিনিও জালিয়াতি করে অন্য দেশের পাসপোর্ট নিয়েছেন।

দুবাই থেকে হঠাৎ কেন ওমানে পালালেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মুসার ভাষ্য, অনেক দিন ধরেই তার পরিকল্পনা ছিল ওমানের ‘পাঁচ আউলিয়ার’ মাজার দেখতে যাবেন। এ লক্ষ্যে মে মাসের শুরুতে ওমান যান। তবে মুসার এই যুক্তি বিশ্বাসযোগ্য নয় গোয়েন্দাদের কাছে। তাদের ধারণা, ওমান হয়ে ভিন্ন কোনো দেশে পালানোর চেষ্টায় ছিলেন মুসা। জিজ্ঞাসাবাদে মুসা ঢাকার কার কার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ হয়, তাদের ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়েছেন। আর অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে ধারণা দেন। এমনকি টিপু হত্যা মিশন সফল করতে কোথায় কোথায় পরিকল্পনা বৈঠক হয়েছিল, সে ব্যাপারে গোয়েন্দাদের তথ্য দিয়েছেন। হত্যা মিশনে যাদের ব্যবহার করা হয়, তাদের নিয়ে গোড়ানের একটি আস্তানায় তাঁরা পরিকল্পনা বৈঠক করেছিলেন।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট আরেকটি সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের মাধ্যমে ওমানের বিমানবন্দরে যখন মুসাকে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন তাঁর কাছে মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট ছাড়া আর কিছু ছিল না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ইন্টারপোল একটি প্লাস্টিকের হাতকড়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে দেয়। যাতে ওই হাতকড়া পরিয়ে বিমানে করে তাকে দেশে ফেরত আনা যায়। কোনো ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে অপরাধীকে আনতে হলে তার হাত-পায়ে ধাতব কিছু পরানো যায় না। মুসাকে যখন শক্ত প্লাস্টিকের হাতকড়া পরানো হয়েছিল তখন তিনি বলছিলেন, ‘কোনো কিছু না পরালেও তিনি পালিয়ে যাবেন না।’

তবে প্লাস্টিকের হাতকড়া না পরানোর ঝুঁকি নেয়নি বাংলাদেশি পুলিশ। ঢাকায় মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে এনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের হাতকড়াটি কেটে ফেলা হয়। মুসার বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য বলছে, তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম। বাবার নাম আবু সাঈদ শিকদার। জন্ম ১৯৭৯ সালে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তার নামে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এক সময় মুসা মিরপুরকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী থাকলেও ধীরে ধীরে ঢাকায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.