সাইজ করছি, বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পুলিশ বক্সে হামলাকারীরা

সাইজ করছি, বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পুলিশ বক্সে হামলাকারীরা

রাজধানীর জুরাইনে পুলিশ বক্সে হামলার পর মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকজন হামলাকারী নিজেদের মধ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। হামলার পর তারা একে অপরকে ফোনে বলে, ‘সাইজ করছি।’

হকার ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকদের সঙ্গে ‘সবুজ সংঘ’ নামে স্থানীয় একটি সংগঠনের সদস্যরাও এই হামলায় অংশ নেয়। যারা ইয়াসিন আরাফাত ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে

এসেছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশ। হামলাকারীদের ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হামলার কথা স্বীকার করেছে।

এ ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) ওয়ারী বিভাগ। ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আশরাফ হোসেন জানিয়েছেন,

ঘটনার দিন ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তদন্ত করে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত আরও ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত ৭ জুন রাজধানীর ওয়ারীর জুরাইন রেলগেট এলাকায় উল্টো পথে আসা মোটরসাইকেল আটকে কাগজপত্র দেখতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে ট্রাফিক সার্জেন্ট ও পুলিশ বক্সে হামলা করে কয়েকশ মানুষ। এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে আহত সার্জেন্ট আলী হোসেন বাদী হয়ে শ্যামপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় নামীয় তিন জন এবং অজ্ঞাত ৪০০ জনকে আসামি করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, হামলার পর হামলাকারীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে একজন আরেকজনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। এর বেশকিছু অডিও আমাদের কাছে রয়েছে। এদের একজন অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে ফোন করে বলে, ‘সাইজ করছি সবগুলোরে।’ ওই হামলাকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে পুরো বিষয়টি শোনানোর পর সে অনুতপ্ত হয়েছে। এ হামলা অন্যায় হয়েছে বলেও স্বীকার করেছে সে।

ঘটনার দিন মোটরসাইকেল চালক ও বার্তা বিচিত্রা পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া সোহাগ উল ইসলাম রনি, তার স্ত্রী ইয়াসিন জামান নিশান মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। উল্টো পথে আসায় পুলিশ তাদের গতিরোধ করে কাগজ চায়। এ সময় রনিও পুলিশের কাছে কাগজ চাইলে বাকবিতাণ্ডা শুরু হয়। এরপর তাকে পুলিশ বক্সে নিয়ে গেলে তার স্ত্রী ইয়াসিন জামান নিশান চিৎকার শুরু করেন। মানুষ জড়ো হয়। নিশান তার ভাই ইয়াসিন আরাফাত ভূঁইয়াকে বিষয়টি জানায়। তিনি অনেক লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। শুরু হয় হামলা। রনি হামলার ভেতরেই লাইভ করেন। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে চলতে থাকে এমন হামলার ঘটনা। এতে ব্যাটারি চালিত রিকশাচালক ও হকাররাও যোগ দেন।

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থতি স্বাভাবিক করা হয়। এতে গুরুতর আহত হন তিন পুলিশ সদস্য। তারা হলেন, সার্জেন্ট আলী হোসেন, ট্রাফিক কনস্টেবল সিরাজুল ইসলাম ও শ্যামপুর থানার উপপরিদর্শক উৎপল চন্দ্র। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি প্রথমে শ্যামপুর থানা পুলিশ তদন্ত করে। এরপর ডিবি পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডিবি তদন্ত শুরুর পর ১৭ জনকে গ্রেফতার করে। তারা সবাই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হামলার সময় ইয়াসিন জামান নিশান তার ভাইকে মোবাইলে ফোন দেয়। এরপর তার ভাই ইয়াসিন আরাফাত ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে প্রায় একশ’ লোক নিয়ে এসে হামলা শুরু করে। ইয়াসিন আরাফাত সবুজ কদতমতলীতে ‘সবুজ সংঘ’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তারা বেশি মারমুখী ছিল।’ তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘হামলাকারীরা বেশিরভাগই আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা একটি সুযোগ পেয়ে জনতার কথা বলে হামলা চালিয়েছে।’হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করছে পুলিশ। এর মধ্যে অনেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর মোটরসাইকেল চালক ও বার্তা বিচিত্রা পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া সোহাগ উল ইসলাম রনি, তার স্ত্রী ইয়াসিন জামান নিশান ও নিশানের ভাই ইয়াসিন আরাফাত ভূঁইয়াসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইয়াসিন জামান নিশান অন্তঃসত্ত্বা থাকায় তার জামিন হয়। এরপর ইয়াসিন আরাফাত ভূঁইয়ারও জামিন হয়।

ইয়াসিন জামান নিশানের বিষয়ে একজন সিনিয়র আইনজীবীর স্ত্রী অভিযোগ করেন। তিনি ডিবি পুলিশ কার্যালয় এসে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে যান। যা যাচাই বাছাই করছে পুলিশ। ডিবি পুলিশ জানতে পেরেছে, যে মোটরসাইকেলটি রনি ড্রাইভ করছিলেন, সেটির নিবন্ধন তার নামে না। অপর একজনের গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আশরাফ হোসেন জানান, মামলাটি তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে আদালতে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.